বাঁকুড়ার মেজিয়ায় নতুন স্টিল কারখানার শিলান্যাস মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর! বিপুল কর্মসংস্থানের ঘোষণা
West Bengal
-Ritesh Ghosh
বাঁকুড়ার মেজিয়ায় দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত প্রস্তুতকারক সংস্থা শ্যাম স্টিলের নতুন ইউনিটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যে নতুন সরকারের মেয়াদ মাত্র দুই মাস। আর এই অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যের শিল্পায়নের পথে এটি এক অত্যন্ত বড় এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে মনে করা হচ্ছে।
এদিন মেজিয়ার এই নতুন শিল্প প্রকল্পটির শিলান্যাস অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর পাশে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য মন্ত্রিসভার একাধিক হেভিওয়েট সদস্য। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নবনিযুক্ত শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। ডানকুনির পর লাক্স কোজি এবং এবার মেজিয়ায় শ্যাম স্টিলের এই বড় সম্প্রসারণ প্রকল্প রাজ্যের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় গতি বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শ্যাম স্টিল কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, বাঁকুড়ার মেজিয়ার এই নতুন ইস্পাত করখানাটি সম্পূর্ণভাবে চালু হলে এলাকার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে এই বৃহৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সংলগ্ন এলাকায় একাধিক ছোট-বড় সহায়ক ও অনুসারী শিল্প গড়ে ওঠার বিপুল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা স্থানীয় মানুষের আর্থ-সামাজিক স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ আরও বাড়িয়ে দেবে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ইস্পাত কারখানার মতো একটি বড় শিল্প প্রকল্প কোনও অঞ্চলে গড়ে উঠলে তার হাত ধরে পরিবহণ, খুচরো ব্যবসা, নির্মাণ সামগ্রী এবং পরিষেবা কর্মের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ ঘটে। এর ইতিবাচক সামাজিক প্রভাব পড়তে চলেছে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং মেদিনীপুরের মতো পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলির সাধারণ মানুষের ওপর। ফলে এলাকার সামগ্রিক ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো অনেকটাই মজবুত হবে।
অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চ থেকে শিল্প-সমৃদ্ধ বাংলা গড়ার ডাক দিয়ে রাজ্যের নতুন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় এক সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, কাজের সন্ধানে বাংলার যুবসমাজ ও দরিদ্র পরিযায়ী শ্রমিকদের আর সুদূর ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে হবে না। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজেদের রাজ্যে ফিরিয়ে এনে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য রাজ্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে কাজ শুরু করেছে।
শিল্পমন্ত্রী সরকারের আগামী পাঁচ বছরের লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে বলেন, “আমরা বাংলার সাধারণ মানুষের জন্য এবং পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা খুব দ্রুত শূন্যে নামিয়ে আনতে দিনরাত পরিশ্রম করব। আগামী পাঁচ বছরে আমরা যে উন্নয়নমূলক কাজ করে দেখাব, রাজ্যের প্রতিটি মানুষ তা সরাসরি অনুভব করবেন। আমাদের মূল কাজ হলো শিল্পের সমস্ত ঘাটতিগুলি যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মেটানো এবং বাংলার যুবসমাজের পাশে দাঁড়ানো।”
শিল্পের মানচিত্রে বাংলাকে দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থানে নিয়ে যেতে নবগঠিত রাজ্য সরকার মোট ১৫ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বিনিয়োগের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। শিল্পমন্ত্রী জানান, এই বিনিয়োগের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার মতো বড় অংশ খরচ করা হবে ক্ষুদ্র, ছোট এবং মাঝারি শিল্প অর্থাৎ এমএসএমই (MSME) ক্ষেত্রে। এই সুসংহত বিনিয়োগের ফলে রাজ্যে মোট ৭৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্য রাখার সময় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানান যে, যারা রাজ্যের এই ইতিবাচক উন্নয়নের জোয়ারে সরকারের শরিক হতে চান, তাঁদের সবাইকে আন্তরিকভাবে স্বাগত। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, নতুন প্রশাসন শিল্পপতিদের জন্য লাল ফিতের আমলাতান্ত্রিক ফাঁস সম্পূর্ণ দূর করে একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত এবং দুর্নীতিমুক্ত নতুন শিল্প পরিবেশ বাংলায় গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
একই সঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিগত সরকারের শাসনকাল ও তাঁর নীতির তীব্র সমালোচনা করতে ছাড়েননি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকে সরাসরি কটাক্ষ করে শুভেন্দু অধিকারীর পরামর্শ, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর উচিত মেজিয়ার এই নয়া প্ল্যান্টের ভেতরটা এসে নিজের চোখে একবার ঘুরে দেখে যাওয়া, কীভাবে কোনও সিন্ডিকেট রাজ এবং অহেতুক বাধা ছাড়া আধুনিক উপায়ে শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে।
রাজনৈতিক আক্রমণ শানিয়ে এদিন মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “আগের আমলে হিন্দিভাষী মানুষ দেখলেই বলতেন, বাংলাকে গুজরাত হতে দেব না। আমি পরিষ্কার বলতে চাই, বাংলার সংস্কৃতি ও মাটির টান আজও সম্পূর্ণ অটুট রয়েছে। কিন্তু এবার বাংলায় বিজেপি সরকার না এলে এবং সময়মতো পরিবর্তন না হলে সমস্ত বড় বড় বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশায় চলে যেত।”
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে বাংলায় ব্যবসা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাস্তায় মালবাহী গাড়ি কিংবা পণ্যবোঝাই লরি বের করলেই পুলিশের একাংশ অনৈতিকভাবে টাকা আদায়ের জন্য হাত পাতত। সর্বত্র সিন্ডিকেট বাণিজ্যের দাপট এবং ভয়ের সামাজিক পরিবেশ ছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় বিনিয়োগকারীরা আবার রাজ্যে ফিরছেন।
মেজিয়ায় শ্যাম স্টিলের এই নতুন প্ল্যান্ট চালুর ঘোষণার মাধ্যমে পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থানের দাবি পূরণের পথে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হল। পরিবর্তিত এই নতুন রাজনৈতিক পটভূমিতে বিপুল বিনিয়োগ এবং প্রতিশ্রুত নতুন চাকরি আগামী পাঁচ বছরে কীভাবে বাস্তবে সম্পূর্ণ রূপায়িত হয় এবং রাজ্যের অর্থনৈতিক চেহারায় নাটকীয় পরিবর্তন আনতে পারে, এখন সেদিকেই গভীর আগ্রহে নজর রাখছেন আমজনতা ও রাজনৈতিক মহল।


Post Comment