ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি নিয়ে ছড়ানো গুজবে কান দেবেন না! আসল সত্য জানাল পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক
India
-Ritesh Ghosh
পেট্রোল ও ডিজেলে ইথানল মেশানোর কর্মসূচি (E20) নিয়ে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। ইঞ্জিন বিকল হওয়া, মাইলেজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া বা গাড়ির ওয়ারেন্টি বাতিল হওয়ার মতো অবৈজ্ঞানিক দাবিগুলো সামনে আসায় সাধারণ গাড়ি চালকদের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এই পরিস্থিতিতে দেশের নাগরিকদের আশ্বস্ত করতে এবং প্রকৃত সত্য জানাতে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক বিস্তারিত ১০ দফার ক্লারিফিকেশন জারি করেছে।
কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির এই প্রক্রিয়াটি কোনও ক্ষণস্থায়ী বা পরীক্ষামূলক পদ্ধতি নয়। এটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সঠিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং কড়া আইনি সুরক্ষাবলয়ের ওপর ভিত্তি করেই ভারতে গড়ে তোলা হয়েছে। দেশ মূলত ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে সেই সময়সীমা এগিয়ে এনে অনেক আগেই, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারত এই মাইলফলক অর্জন করতে পেরেছে।

মন্ত্রকের তরফে আরও জানানো হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কানাডা, থাইল্যান্ড এবং জাপানের মতো একাধিক উন্নত দেশে গত কয়েক দশক ধরে ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল সফলভাবে যানবাহনে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই এই জ্বালানি নিয়ে অহেতুক ভয়ের কোনও কারণ নেই। ভারতের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও স্বনির্ভরতা মজবুত করতেই এই পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যা দেশজুড়ে এখন অত্যন্ত সফলভাবে চালু রয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছিল যে, গাড়ির জ্বালানি ট্যাঙ্কে ই২০ ব্যবহারের কারণে ইঞ্জিন চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সরকার এই ধরনের সমস্ত দাবি নাকচ করে দিয়েছে। অটোমোটিভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (ARAI), ইন্ডিয়ান অয়েল এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পেট্রোলিয়ামের যৌথ গবেষণায় প্রমাণিত যে, এই জ্বালানির কারণে গাড়ির ইঞ্জিনের কোনো ধাতব বা প্লাস্টিকের অংশে ক্ষতি বা জং ধরার ঝুঁকি নেই।
তবে অত্যন্ত পুরোনো মডেলের কিছু গাড়ির ক্ষেত্রে রাবারের তৈরি নির্দিষ্ট কিছু পার্টস স্বাভাবিকের চেয়ে একটু দ্রুত পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে। এর বাইরে রাস্তায় চলমান সাধারণ যানে এই তেল ব্যবহারে আকস্মিক ক্ষতির ঝুঁকি নেই। এআরএআই-এর গবেষকেরা গাড়িতে ৪০ হাজার কিলোমিটার এবং দুই চাকার যানে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার ড্রাইভিং পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন এতে পারফরম্যান্স বা চালানোর সামগ্রিক অভিজ্ঞতায় কোনও খারাপ প্রভাব পড়েনি।
জ্বালানির কার্যকারিতা প্রসঙ্গে পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ পেট্রোলের তুলনায় ইথানল মিশ্রিত তেলের ব্যবহারে মাইলেজে যেটুকু পরিবর্তন ঘটে তা একেবারেই সামান্য ও নগণ্য। উল্টে ইথানলের উচ্চ অকটেন রেটিংয়ের কারণে আধুনিক ইঞ্জিনগুলো আরও মসৃণভাবে চলে। একই সঙ্গে মন্ত্রক জোর দিয়ে জানিয়েছে যে, নির্ধারিত নিয়ম মেনে ই২০ তেল ব্যবহারের কারণে প্রস্তুতকারক সংস্থা বা বিমা কোম্পানিগুলো গাড়ির ওয়ারেন্টি বা ইন্স্যুরেন্সের সুবিধা কোনওভাবেই বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না।
প্রতি এক লিটার ইথানল উৎপাদনে ১০ হাজার লিটার জলের অপচয় হয় বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে দাবি করা হয়েছে, মন্ত্রক তাকে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইথানল তৈরির জন্য দেশের খাদ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত থাকা শস্য ব্যবহার করা হয়। এছাড়া পরিশোধনের আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে কারখানাগুলোতে প্রতি লিটার পরিবেশবান্ধব ইথানল তৈরি করতে বর্তমানে মাত্র ৩ থেকে ৫ লিটার প্রক্রিয়াজাত জলের প্রয়োজন হয়ে থাকে।
দেশের ইথানল কারখানাগুলোতে এখন সফলভাবে ‘জিরো লিকুইড ডিসচার্জ’ (ZLD) ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে কারখানার ব্যবহৃত জল পুনরায় পরিশোধন করে ভেতরের সিস্টেমে বারবার ব্যবহার করা যায়, যা প্রাকৃতিক জলের অপচয় কমায়। পাশাপাশি ইথানল তৈরিতে ভুট্টাকে ব্যাপক উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যা জোগানের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ভুট্টা চাষে ধানের তুলনায় জলের খরচ অনেক কম লাগে।
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি অদ্ভুত মিম বা পোস্টে দাবি করা হয়েছিল যে, এই জ্বালানি মিষ্টি হওয়ায় পিঁপড়ে বা মৌমাছিকে আকৃষ্ট করে। মন্ত্রক স্পষ্ট করেছে, জ্বালানি মানের ইথানল তৈরির সময় সমস্ত অবশিষ্টাংশ শর্করা দূর করা হয়। এতে মেশানো বিশেষ উপাদানের কারণে কীটপতঙ্গ দূরে থাকে এবং সেখানে পেট্রোলের তীব্র গন্ধই প্রধান থাকে। একইভাবে রিটেল পাম্প এবং আধুনিক ফুয়েল ট্যাঙ্কে বিশেষ সুরক্ষা থাকায় জল প্রবেশের আশঙ্কা নেই।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আখের রস সরাসরি পেট্রোলের সাথে মেশানোর ছবি ও ভিডিওগুলো সম্পূর্ণ এডিটেড এবং জাল বলে চিহ্নিত করেছে মন্ত্রক। সাধারণ জনগণকে সতর্ক করে জানানো হয়েছে, কারখানাগুলোতে ইথানল তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। এটি সরাসরি মেশানো যায় না; আখের রস পরিশোধিত হওয়ার পরই বৈজ্ঞানিক অনুপাত মেনে তেল রিফাইনারিতে পেট্রোলের সঙ্গে মেশানো হয়। অহেতুক গুজবে কান দিয়ে নিজের গাড়ির ক্ষতি না করতে আবেদন করেছে সরকার।
২০১৪-১৫ সরবরাহ বর্ষ থেকে শুরু হওয়া এই ইথানল কর্মসূচির কল্যাণে ভারতের অর্থনীতি এক নতুন রূপ পেয়েছে। এই পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ ব্যাপক হারে কমানো গেছে, যার ফলে দেশের প্রায় ১.৯ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে। একই সঙ্গে এই জাতীয় উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের কৃষক সম্প্রদায়কে সরাসরি ১.৬ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
পরিবেশ দূষণ রোধেও ভারত সরকারের এই ব্লেন্ডিং কার্যক্রম এক বড় মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এই পরিকল্পনার ফলে প্রায় ৯৩০ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে ছড়ানো নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। একই সাথে দেশের বার্ষিক অপরিশোধিত তেল আমদানির চাহিদাও গত কয়েক বছরে প্রায় ৩১০ লক্ষ মেট্রিক টন কমানো গেছে। ইথানলের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে ২,০০০ কোটি লিটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যা দেশের টেকসই জ্বালানির লক্ষ্যকে ত্বরান্বিত করে তুলেছে।



Post Comment