তৃণমূল ভবন নজিরবিহীনভাবে দখল ঋতব্রত শিবিরের, বাইরে দাঁড়িয়ে রইল ‘কালীঘাট তৃণমূল’ শিবির
West Bengal
-Ritesh Ghosh
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অলিন্দে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের তীব্র লড়াই এবার এক সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নজিরবিহীন মাত্রা পেল। প্রতীক ও দলীয় তহবিলের অধিকার রক্ষার টানাপোড়েনের পর, এবার দলের ঐতিহাসিক আদি দফতরের ক্ষমতা নিজেদের দখলে নিতে কোমর বেঁধে ময়দানে নামল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী। শুক্রবার সন্ধ্যায় ইএম বাইপাসের ধারের তৃণমূল ভবনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কুক্ষিগত করেন তাঁরা।
এই নজিরবিহীন দখলদারির পর রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম কোনও প্রকাশ্য দলীয় কার্যালয় থেকে উধাও হল তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা দলের তরুণ সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। গেটে টাঙানো নতুন ব্যানারে কেবল জ্বলজ্বল করছে বর্ষীয়ান নেতা অরূপ রায়ের নাম, যেখানে তাঁকে দলের ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কার্যালয়ের গেটে ঝুলছে নতুন তালাও।

এই নাটকীয় ঘটনা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের চমকে দিয়েছে। বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম বিতর্কিত মুখ তথা কোষাধ্যক্ষ আখরুজ্জামান আনসারি দাবি করেন, ইএম বাইপাসের ধারের এই পুরোনো ভবনটি লাখ লাখ সাধারণ তৃণমূল কর্মীর তীব্র আবেগ ও লড়াইয়ের প্রতীক। তাঁরা এখন থেকে এই ভবনটিকে নিজেদের নতুন কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করবেন। এর চাবি এখন সম্পূর্ণভাবে তাঁদেরই নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে তিনি সাফ জানান।
ঋতব্রতের নেতৃত্বাধীন শিবিরের এই পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে এক অত্যন্ত সুপরিকল্পিত আইনি চাল। জানা গিয়েছে, এই চূড়ান্ত নাটক শুরুর আগে শুক্রবার বিকেলেই ইএম বাইপাসের অদূরে একটি বিলাসবহুল হোটেলে বাড়িটির মালিক মন্টু সাহার ছেলে অমিত সাহার সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন বিদ্রোহী নেতারা। সেই বৈঠক ফলপ্রসূ হওয়ার পরই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, আখরুজ্জামান আনসারি এবং ফিরহাদ হাকিমদের ওই কার্যালয়ের দিকে পায়ে হেঁটে রওনা হতে দেখা যায়।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ঋতব্রত শুধুমাত্র বলেন, “পথই পথ মিলিয়ে দেয়।” ঠিক তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দলবল নিয়ে তাঁরা ওই বন্ধ ভবনের ভিতরে ঢুকে বসেন এবং সেখানে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করেন। বাড়িটির মালিকপক্ষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে বেআইনিভাবে তাঁদের সম্পত্তি আটকে রেখেছে এবং ভাড়ার যোগাযোগও করছে না। এই আইনি জটিলতাকেই কাজে লাগিয়েছে ঋতব্রত শিবির।
বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, বাড়ির মালিকের সঙ্গে তাঁদের নতুন করে একটি আইনি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাই এখন থেকে তাঁরাই এই বাড়ি ব্যবহারের সম্পূর্ণ আইনি অধিকারী। ফলে রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি এই দফতর দখলকে কেন্দ্র করে এক জোরালো আইনি ঢাল তৈরি করে ফেললেন বিদ্রোহীরা। যা স্বভাবতই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাট শিবিরের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
বিদ্রোহীদের আকস্মিক এই হানাদারি এবং গেটে তালা লাগানোর খবর চাউর হতেই চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে কালীঘাট শিবিরের অন্দরে। তড়িঘড়ি পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছন কালীঘাটের অত্যন্ত বিশ্বস্ত মুখ তথা উত্তর কলকাতার বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দলের আইটি সেলের অন্যতম প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাসনা চৌধুরীও। কিন্তু দরজায় নতুন তালা ঝুলতে দেখে তাঁরা দীর্ঘক্ষণ বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হন।
কালীঘাট শিবিরের এই প্রতিনিধি দলের জন্য কার্যালয়ের ভেতরে যাওয়ার কোনও পথই ফাঁকা ছিল না। যে দরজায় নতুন তালা দেওয়া হয়েছে, তার চাবি বিদ্রোহীদের কাছে ছিল। কুণাল ঘোষ পুলিশের সঙ্গে কথা বলেও কোনও সুরাহা পাননি। ক্ষুব্ধ কুণাল ঘোষ বলেন, “পুলিশ আমাদের অন্য কোনও গেট দিয়ে ভিতরে ঢোকার অনুমতি দেয়নি। আর একমাত্র যে দরজায় তালা ঝুলছে, আমরা তা ভেঙে ঢুকব না।”
বাইরে দাঁড়িয়েই ক্ষোভে ফেটে পড়েন কুণাল ঘোষ। ঋতব্রত শিবিরকে বেনজির আক্রমণ শানিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, “আজ যাঁরা এখানে এসে নিজেদের আস্ফালন দেখাচ্ছেন, তাঁরা কি দল থেকে পদত্যাগ করে কোনও নির্দল প্রতীকে সাধারণ ভোটে জিতে এসেছেন? এমন চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতি আগে কখনও এরাজ্যে দেখা যায়নি।” তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, এই বাড়িটি নিয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত মূল তৃণমূল কংগ্রেসের বৈধ চুক্তি রয়েছে।
বাইপাসের ধারের ঐতিহাসিক এই তৃণমূল ভবনের বাইরে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় তড়িঘড়ি মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। প্রগতি ময়দান থানার উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে গোটা এলাকা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী। পুলিশি ও আধাসামরিক প্রহরায় কার্যালয়ের চারিদিকে উত্তপ্ত থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়।
এই অনভিপ্রেত সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে কুণাল ঘোষ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁরা আইনের কাঠামোর বাইরে গিয়ে কোনও ধরনের উস্কানিমূলক আচরণ বা শান্তিভঙ্গ করতে চান না। দলের সাধারণ কর্মীরা এই ঘটনায় মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্ট পাচ্ছেন। পুরো ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব তথা খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিস্তারিতভাবে জানানো হবে। আইনি পথেই এই অন্যায় দখলের পাল্টা চরম জবাব দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
বৃহস্পতিবারই নতুন দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের ফুলবেঞ্চের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সঙ্গীরা। সেখান থেকে কলকাতায় পা রেখেই তাঁরা এই আগ্রাসী মেজাজে অবতীর্ণ হলেন। দলের প্রতীক চিহ্ন এবং গচ্ছিত আর্থিক তহবিল কাদের অধীন থাকবে, তা নিয়ে দুই শিবিরের ঠান্ডা লড়াই এখন কোর্ট ও কমিশনে চলছে।
কিন্তু প্রতীক আর তহবিলের পাশাপাশি এবার দলের বাহ্যিক পরিকাঠামো বা স্থাবর সম্পত্তি দখল করার এই মরিয়া চেষ্টা কালীঘাট শিবিরের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিল। বিদ্রোহীদের মুখে ‘আমরাই আসল তৃণমূল’ স্লোগান দলের কর্মীদের একাংশের মধ্যে তীব্র ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। অরূপ রায়কে চেয়ারম্যানের আসনে বসিয়ে তাঁরা আদতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্নাতীত কর্তৃত্বকে বাংলা জুড়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে উদ্যত হয়েছেন।
আগামী শনিবার থেকেই বাইপাসের এই পুরনো কার্যালয় থেকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাজকর্ম পুরোদমে শুরু হতে চলেছে। কার্যালয় হাতছাড়া হওয়ার পর কালীঘাট শিবির কতটা দ্রুত এর মোকাবিলা করতে পারে, সেটাই এখন দেখার। দল দখলের এই মরিয়া লড়াই রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই আঞ্চলিক দলের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত কোন আইনি ও রাজনৈতিক পরিণতি পায়, সেদিকেই চোখ রয়েছে সারা বাংলার।



Post Comment