ওড়িশায় শিল্প বিপ্লব! আদানি গ্রুপের ১.০৮ লক্ষ কোটি টাকার মেগা প্রোজেক্ট বদলে দেবে রাজ্যের অর্থনীতি
India
-Ritesh Ghosh
ওড়িশার শিল্প ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। ভারতের মেটাল বা ধাতু ক্ষেত্রে এই যাবৎকালের অন্যতম বৃহত্তম বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে আদানি গ্রুপ। আদানি এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড (এইএল) এবং আবুধাবি ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিসোর্সেস হোল্ডিংস (আইআরএইচ) যৌথভাবে ওড়িশায় একটি সমন্বিত অ্যালুমিনিয়াম কমপ্লেক্স গড়ে তুলতে চলেছে। এই প্রকল্পের মোট আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১.০৮ লক্ষ কোটি টাকা।
আবুধাবির আইএইচসি গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আইআরএইচ এবং আদানি গ্রুপের যৌথ পার্টনারশিপে এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণ একটি গ্রিনফিল্ড উদ্যোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। ৫০:৫০ অংশীদারিত্বের এই যৌথ উদ্যোগটি ওড়িশার ইতিহাসে একক বৃহত্তম প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) হতে চলেছে। একই সঙ্গে এটি ভারতের ধাতু খাতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগের একটি মাইলফলক।

এই বৃহৎ শিল্প উদ্যোগের আওতায় ওড়িশায় বিভিন্ন ধরনের আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কমপ্লেক্সে বার্ষিক ৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি অ্যালুমিনা রিফাইনারি এবং ২ মিলিয়ন মেট্রিক টন ক্ষমতার একটি অ্যালুমিনিয়াম স্মেল্টার তৈরি করা হবে। এছাড়া প্রকল্পের সার্বিক শক্তির চাহিদা মেটাতে একটি ৪,০০০ মেগাওয়াটের নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্র (ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট) স্থাপন করা হবে।
মেটাল কমপ্লেক্সটিকে আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে এখানে বার্ষিক ১ মিলিয়ন মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতার ডাউনস্ট্রিম ম্যানুফ্যাকচারিং পার্ক গড়ে তোলা হবে। সম্পূর্ণ প্রকল্পটি দুটি প্রধান ধাপে বাস্তবায়িত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই সংস্থা। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৬৬,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে বিনিয়োগের পরিমাণ থাকবে প্রায় ৪৪,০০০ কোটি টাকা।
এই মেগা প্রোজেক্টের জন্য ওড়িশা সরকারের সঙ্গে এই দুই সংস্থার একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি, রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী সম্পদ চন্দ্র সোয়েইন এবং আদানি গ্রুপের প্রতিনিধি করণ আদানির উপস্থিতিতে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রকল্প ওড়িশার শিল্প পরিকাঠামোকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
এই মেগা অ্যালুমিনিয়াম প্রকল্পের হাত ধরে ওড়িশার যুবসমাজের জন্য বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে চলেছে। প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৫৩,৫০০ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর মধ্যে নির্মাণ পর্বেই প্রায় ৩৫,০০০ মানুষ কাজ পাবেন, যা স্থানীয় শ্রমবাজারের পাশাপাশি সংলগ্ন এলাকার অর্থনীতিতে বড় গতি আনবে।
অন্যদিকে, প্রকল্পটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর খনি নিষ্কাশন, অ্যালুমিনা রিফাইনিং, অ্যালুমিনিয়াম গলানো এবং ডাউনস্ট্রিম উৎপাদন ক্ষেত্রে আরও প্রায় ১৮,৫০০ কর্মী স্থায়ীভাবে নিযুক্ত হবেন। শুধু প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানই নয়, এই মেগা প্রজেক্টের কারণে লজিস্টিকস, ইঞ্জিনিয়ারিং, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রচুর পরোক্ষ কাজের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই বিশাল উদ্যোগে ডাউনস্ট্রিম ম্যানুফ্যাকচারিং পার্কের অন্তর্ভুক্তি ওড়িশার স্থানীয় ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) সেক্টরকে ব্যাপকভাবে চাঙ্গা করবে। এই পার্কে বিভিন্ন ধরনের সহযোগী ও উৎপাদনকারী ইউনিট গড়ে উঠবে, যা ভারী শিল্প ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ তৈরির প্রক্রিয়াকে সহজ করবে। এতে অভ্যন্তরীণ ব্যবসার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
ওড়িশার এই প্রকল্প কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ ধাতব চাহিদাই মেটাবে না, বরং বিশ্বব্যাপী সরবরাহের শৃঙ্খলেও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আধুনিক এই অ্যালুমিনিয়াম কমপ্লেক্সটি থেকে উৎপাদিত উচ্চমানের ধাতু বিভিন্ন উন্নত ও আধুনিক শিল্পে ব্যবহৃত হবে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবহণ, নির্মাণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ক্ষেত্র, প্যাকেজিং এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে নবায়নযোগ্য শক্তি ও অ্যাডভান্সড ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি বলেন, এই বিশাল বিনিয়োগ ওড়িশার খনি নিষ্কাশন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াকরণ এবং ডাউনস্ট্রিম উৎপাদন পর্যন্ত সামগ্রিক ভ্যালু চেইনকে একত্রিত করতে সাহায্য করবে। এটি বিশ্বব্যাপী অ্যালুমিনিয়ামের সরবরাহ নিশ্চিত করবে এবং রাজ্যটিকে আন্তর্জাতিক শিল্প মানচিত্রে একটি শীর্ষস্থানীয় হাবে পরিণত করবে। ওড়িশার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আদানি গ্রুপের প্রতিনিধি করণ আদানি ভারতের সামগ্রিক শিল্প বিকাশে এই যৌথ উদ্যোগের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রস্তাবিত এই অংশীদারিত্ব ওড়িশার প্রতি আদানি গ্রুপের আস্থার এক বড় প্রমাণ। এটি কেবলমাত্র নতুন কাজের সুযোগই তৈরি করবে না, বরং ভারতের ধাতু উৎপাদন খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখবে এবং বিশ্ব বাজারে ভারতের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা বাড়াবে।
আবুধাবির আইএইচসির সহযোগী সংস্থা আইআরএইচ-এর প্রধান সৈয়দ বাসার শুয়েব এই চুক্তির বিষয়ে তাঁর গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, বিশ্বস্ত অংশীদারের সঙ্গে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত প্রকল্প গড়ে তোলাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। এই বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রসার এবং সাপ্লাই চেইনের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে বড় ধরনের অবদান রাখবে, যা বর্তমান বিশ্ববাজারে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর যৌথ অংশীদার সংস্থা দুটি এখন ওড়িশা সরকারের সহায়তায় দ্রুত প্রকল্পটির পরবর্তী পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে কাজ শুরু করবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশ ও অন্যান্য বিধিবদ্ধ সরকারি অনুমোদন লাভ এবং প্রাথমিক পরিকাঠামো নির্মাণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করা।
এই মেগা প্রোজেক্টটি ওড়িশাকে ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও ধাতু হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। বিপুল বিনিয়োগ এবং উন্নত সবুজ প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি হতে চলা এই অ্যালুমিনিয়াম কমপ্লেক্স ভারতের শিল্পক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক মজবুত অর্থনৈতিক ভিত উপহার দেবে।



Post Comment