হলফনামা তলব! ২১ জুলাইয়ের সভা ইস্যুতে হাইকোর্টের তোপের মুখে মমতা-অভিষেক
Kolkata
-Ritesh Ghosh
কলকাতা স্তব্ধ করে রাজনৈতিক কর্মসূচি আয়োজনের দীর্ঘদিনের ট্র্যাডিশন নিয়ে আবারও কড়া অবস্থান নিল কলকাতা হাইকোর্ট। একুশের জুলাইয়ের কালীঘাট তৃণমূলের দলীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করার অভিযোগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কালীঘাট তৃণমূলের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আদালত। এই মর্মে দুই শীর্ষ নেতার কাছে আদালত অবমাননার কারণ জানতে চেয়ে হলফনামা তলব করেছে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।
আইনি প্রক্রিয়ার এই নতুন মোড় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র আলোড়ন তৈরি করেছে। বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছে যে, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে অভিযুক্তদের হলফনামা দিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। যদি সমস্ত পক্ষ নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে বক্তব্য পেশ করে, তবে আগামী ১৭ অগাস্ট এই মামলার পরবর্তী শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে। আদালতের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে রাস্তা আটকে সমাবেশ করার অভিযোগের সুরাহা করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছিল মূলত ২০১৮ সালে। সেই সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস সহ রাজ্যের প্রায় ৩৮টি রাজনৈতিক দলকে আইনি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়েছিল। শুনানির সময় আদালত স্পষ্ট পর্যবেক্ষণে জানিয়েছিল যে, কলকাতায় বড় মাপের রাজনৈতিক সভার জেরে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হচ্ছে।
তৎকালীন ডিভিশন বেঞ্চ অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়েছিল যে, জনসভার কারণে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক যাতায়াত ব্যাহত করা যাবে না। বিশেষ করে রোগীদের কথা ভেবে অ্যাম্বুল্যান্সের মতো জরুরি পরিষেবার গাড়ি আটকে রাখা যাবে না। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, সভার জন্য কলকাতার প্রধান রাস্তাগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা যাবে না এবং পথচারী ও যানবাহনের যাতায়াতের জন্য রাস্তার অন্তত একাংশ সবসময় সচল রাখতে হবে।
কিন্তু প্রশাসনের নাকের ডগায় আদালতের সেই নির্দেশ ও নিয়মের তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ধরে একুশে জুলাইয়ের মতো বড় সমাবেশগুলোতে সম্পূর্ণ রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠতে থাকে। এই প্রেক্ষিতেই আদালতের সেই ঐতিহাসিক নির্দেশ লঙ্ঘন করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে নতুন করে এই আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হয়। যার জেরেই এবার খোদ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হলফনামা তলব করা হয়েছে।
এদিকে শুক্রবার এই মামলার শুনানির সময় কলকাতা হাইকোর্টে এক অত্যন্ত নাটকীয় পরিস্থিতি এবং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণের জটিলতার চিত্র ফুটে ওঠে। শুনানিতে প্রবীণ আইনজীবী ও তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অংশ নিয়ে জানান যে, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সওয়াল করতে প্রস্তুত। কিন্তু এই পর্যায়ে আদালত থেকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় যে, মামলার সহ-অভিযুক্ত তথা দলীয় সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে আইনি সওয়াল কে করবেন?
এই প্রশ্নের মুখে বর্ষীয়ান আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুটা থমকে যান এবং কোনও ইতিবাচক বা স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। তাঁর এই অপ্রত্যাশিত নীরবতা ও মৃদু ইতস্তত ভাব আদালত কক্ষে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আইনি এবং রাজনৈতিক মহলের মতে, এই দ্বিধার পিছনে রয়েছে তৃণমূলের অন্দরে সাম্প্রতিক কিছু ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক টানাপড়েন, যা আইনি লড়াইয়ের মঞ্চেও প্রকাশ পেয়ে গেল।
রাজনৈতিক সূত্রের খবর, কিছুদিন আগে সুপ্রিম কোর্ট ও রাজ্য স্তরে বিধানসভায় সই জাল করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলা থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী প্যানেল থেকে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে আকস্মিকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তে চরম ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করেছিলেন প্রবীণ এই আইনজীবী। ঘটনার পরেই তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, ভবিষ্যতে তিনি আর কখনও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিষয়ে আইনি প্রতিনিধিত্ব করবেন না।
আদালতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অনড় মনোভাব স্পষ্ট হওয়ার পর পরিস্থিতি ভিন্ন মাত্রা নেয়। আদালত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি বিবেচনা করে জানায় যে, কোনও অভিযুক্তের নির্দিষ্ট আইনজীবী না থাকলে বা তিনি প্রতিনিধি নিয়োগ না করলে, আদালতের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি রুল জারি করা হতে পারে। এই কঠিন বার্তা প্রকারান্তরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনি টিমকেও সতর্কবার্তা দিল বলে মনে করা হচ্ছে।
কলকাতা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং রাজনৈতিক দলগুলির স্বেচ্ছাচারিতার প্রশ্নে এই মামলা এক বড় মাইলফলক হতে পারে। আইনি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, শাসক দল হোক কিংবা বিরোধী দল, প্রকাশ্য রাস্তায় সভা করার ক্ষেত্রে যদি কঠোর আইনি বিধিনিষেধ আরোপিত হয়, তবে তা বাংলার চিরাচরিত সমাবেশ-সংস্কৃতিকে আমূল বদলে দিতে পারে। সাধারণ নিত্যযাত্রীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই মামলার গতিপ্রকৃতি তাই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ হিসেবে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে দলের দুই শীর্ষ নেতাকে তাঁদের আইনজীবীদের মাধ্যমে বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে হলফনামা জমা দিতে হবে। কলকাতা হাইকোর্টের এই হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত মহানগরের রাস্তা সচল রাখার ক্ষেত্রে কতটা স্থায়ী সমাধান দিতে পারে, এখন তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন সাধারণ রাজ্যবাসী তথা নিত্যযাত্রীরা।



Post Comment