আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে মোজতবাই থাকছেন না! নিরাপত্তার কারণেই শোকগ্রস্ত পুত্রকে আড়াল করছে ইরান

আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে মোজতবাই থাকছেন না! নিরাপত্তার কারণেই শোকগ্রস্ত পুত্রকে আড়াল করছে ইরান

International

-Ritesh Ghosh

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে তাঁর সন্তান মোজতবা খামেনেই সশরীরে উপস্থিত নাও হতে পারেন। ইজরায়েলের সঙ্গে চলমান তীব্র উত্তেজনার মাঝে মোজতবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব বলেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ভারতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ হাকিম ইলাহি খামেনেইয়ের শেষকৃত্যের প্রাক্কালে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তেহরান যাওয়ার পথে নতুন দিল্লির বিমানবন্দর থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাকিম ইলাহি জানান, এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নিরাপত্তার খাতিরে নেওয়া হয়েছে। মার্কিন ও ইজরায়েলি হামলায় খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর পুরো ইরান জুড়ে এখন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। খামেনেইয়ের প্রয়াণ সেদেশের শাসকের কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি হলেও তারা জনসাধারণের গভীর আবেগ ও ভক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোকের ঘোষণা করেছে।

Ayatollah Khamenei funeral ceremony security protocols in Tehran

সম্প্রতি ইরানে তাঁর পরিচিত মহলের সঙ্গে আলোচনার সূত্রে হাকিম ইলাহি জানান, মোজতবা নিজে সর্বসাধারণের সামনে আসতে এবং এই শোকাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে শামিল হতে আগ্রহী ছিলেন। তবে ইরানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা বিভাগ এই মুহূর্তে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। ইজরায়েলি বিমান হামলার প্রবল আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে তাঁকে অন্তরালেই রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর প্রকাশ্যে আসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এদিকে তেহরানে শুরু হওয়া এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানকে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র কেবল একটি ধর্মীয় শোকের অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে তারা তাদের বৈপ্লবিক আদর্শ ও প্রতিরোধের স্পৃহা প্রদর্শনের বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তারা বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করতে চেষ্টা করছে যে খামেনেইয়ের প্রয়াণে তাদের রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো মোটেই দুর্বল হয়ে পড়েনি।

এই গভীর সংকটের মুহূর্তে ইরান প্রশাসন ভারতকে পাশে পেতে চেয়েছে। বিশেষ করে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং ভারতের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদকে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য তেহরানের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশে সলমন খুরশিদ খাড়গের পাঠানো একটি বিশেষ শোকবার্তা নিয়ে ইরানের রাজধানী তেহরানে যাচ্ছেন।

তেহরান সফরের বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ জানিয়েছেন, ভারত ও ইরানের গভীর কূটনৈতিক সম্পর্ক বহু বছরের পুরোনো এবং কঠিন সময়ে বিশ্বস্ত বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো নয়াদিল্লির কূটনৈতিক কর্তব্য। আন্তর্জাতিক টানাপোড়েনের মাঝেও ভারতের অবস্থান নিয়ে তেহরান কখনও ক্ষোভ বা আপত্তি তোলেনি এবং ভারতও যেকোনও আঞ্চলিক বিপদে ইরানের পাশে মানবিক কারণে সবসময় সংহতি জানিয়ে এসেছে।

খুরশিদ স্মরণ করিয়ে দেন যে, অতীতে অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে যখন তিনি জেনেভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনে গিয়েছিলেন, তখন ইরান ভারতের কাশ্মীর নীতিকে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিল। এছাড়া সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালীতে ভারতের পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতেও তেহরান অত্যন্ত সদর্থক ভূমিকা নিয়েছিল। তাই এই পারস্পরিক আস্থা ও কৃতজ্ঞতার সম্পর্কের খাতিরেই ভারত শোক প্রকাশে শামিল হচ্ছে।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সাথে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সম্পর্কে ফাটল ধরতে দেয়নি ভারত। খুরশিদের মতে, এই সফর কেবল একটি সাধারণ প্রোটোকল রক্ষা করা নয়, বরং শোকার্ত একটি দেশের মানুষের সঙ্গে বেদনা ভাগ করে নেওয়ার এক গভীর মানবিক প্রয়াস, যা সময়ের জটিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দুই দেশের ভারসাম্যকে নতুন পথ দেখাবে।

ইরানের ৪৭ বছরের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের প্রয়াণ একটি বড় যুগের অবসান বলে চিহ্নিত হচ্ছে। তিনি কেবল দেশটির সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারী শাসক ছিলেন না, বরং ইরানের কোটি কোটি শিয়া ধর্মাবলম্বীদের কাছে দ্বাদশ ইমামের প্রতিনিধি এবং সর্বপ্রধান আধ্যাত্মিক অভিভাবক ছিলেন। যুদ্ধের একেবারে শুরুর দিকে শত্রুর আচমকা বিমান হামলায় তাঁর মৃত্যুতে ইরানিদের ধর্মীয় ভাবাবেগে প্রতিবাদের আগুন উসকে দিয়েছে।

ইরানের রাজধানী তেহরানে শুরু হওয়া বিশাল শোকযাত্রা ধীরে ধীরে দেশটির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের বিভিন্ন পবিত্র ধর্মীয় স্থানে গিয়ে শোক সভার কাজ সম্পন্ন হবে। খামেনেইয়ের চলে যাওয়ার ফলে যে রাজনৈতিক শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে, তা মেটানো ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের কাছে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা হতে চলেছে।

ইরানে খামেনেইয়ের মৃত্যুতে শুরু হওয়া তীব্র শোককে দেশটির বহু সাধারণ নাগরিক ইমাম হোসেনের কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির সঙ্গে তুলনা করছেন, যা শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় চেতনাকে ভীষণভাবে স্পর্শ করেছে। এই প্রবল আবেগ ও ঐক্যকে ঢাল করে তেহরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব বিশ্বকে দেখাতে চাইছে যে, কোনও বাহ্যিক প্রতিপক্ষ বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তাঁদের অভ্যন্তরীণ নীতি এবং শাসনযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণকে নাড়িয়ে দিতে পারবে না।

যদিও তেল আভিভ ও ওয়াশিংটন একের পর এক নতুন সামরিক হামলার হুমকি জারি রেখেছে, তবে ইরানের শাসক মহলের দাবি অনুযায়ী তারা যেকোনও হুমকি মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। আয়াতুল্লাহ হাকিম ইলাহি উল্লেখ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক স্তরে বহু দেশ এখন যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের সফল প্রতিরোধের প্রশংসা করছে এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরান প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত মজবুত অবস্থানে রয়েছে।

ইরানের এই রাজনৈতিক পালাবদলের ক্রান্তিলগ্নে আন্তর্জাতিক प्रतिनिधियों তেহরান সফর তাদের এক বড় কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাস জোগাবে। একদিকে যেমন মোজতবা খামেনেইয়ের নিরাপত্তার কারণে আড়ালে চলে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে, অন্যদিকে ভারতের মতো বৃহৎ শক্তির প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি ইরানি প্রশাসনকে নতুন উৎসাহ দেবে, যা আগামী দিনে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে সাহায্য করবে।

Post Comment

You May Have Missed