হোয়াটসঅ্যাপের পর টেলিগ্রাম ও সিগনালকেও ‘ইউজারনেম ফিচার’ বিতর্কে নোটিস কেন্দ্রের
India
-Ritesh Ghosh
অনলাইন প্রতারণা এবং ভুয়ো পরিচয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রুখতে এবার কড়া পদক্ষেপ নিল কেন্দ্রীয় সরকার। জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রাম ও সিগনালকে নোটিশ পাঠাল কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক। ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার স্বার্থে ফোন নম্বরের বদলে যে ‘ইউজারনেম’ ব্যবহার করার সুবিধা এই অ্যাপগুলি দেয়, তা কীভাবে অপব্যবহার ঠেকাবে, তা নিয়েই কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপের পর এবার এই দুই প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে শুরু করল সরকার।
নতুন করে জারি করা এই নির্দেশে টেলিগ্রাম এবং সিগনালের কাছ থেকে গ্রাহক সুরক্ষা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়েছে। ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ফোন নম্বরের বিকল্প এই ব্যবস্থা সাইবার অপরাধীদের জন্য কোনও গোপন অপরাধের নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে কিনা, তা নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখাই সরকারের উদ্দেশ্য। বিশেষ করে টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছে, ভারতের ভৌগোলিক এলাকায় কেন তাদের এই ইউজারনেম পরিষেবা চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হবে?

মোবাইল নম্বরের জায়গায় ইউজারনেমের ব্যবহার শুরু হলে বহু ব্যবহারকারী নিজের পরিচয় আড়াল করার সুযোগ পান। কেন্দ্রীয় বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে প্রতারকরা সহজেই কোনও সেলিব্রিটি বা সরকারি শীর্ষ আধিকারিকের ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে। সাধারণ ব্যবহারকারীরা সত্যতা যাচাই না করেই তাদের সহজে বিশ্বাস করে প্রতারিত হতে পারেন। বিশেষ করে দেশে যে হারে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ ও ফিশিংয়ের মতো অপরাধ বাড়ছে, তার বিরুদ্ধে সুরক্ষার কোনও ফাঁক রাখতে চাইছে না প্রশাসন।
সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটা-র মালিকানাধীন হোয়াটসঅ্যাপকে ভারতে তাদের ইউজারনেম ফিচার চালু করার পরিকল্পনা স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়ার ঠিক পরদিনই এই নতুন পদক্ষেপটি নেওয়া হল। মেটার প্রধান কমপ্লায়েন্স অফিসারকে পাঠানো চিঠিতে কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তির আধিকারিকরা সাইবার সুরক্ষার ঝুঁকির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। একই সঙ্গে মেটা সংস্থাকে পুরো বিষয়টির সন্তোষজনক জবাব দেওয়ার জন্য তিন দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্মগুলির মধ্যে ভারতেই মেটা পরিচালিত হোয়াটসঅ্যাপ সবচেয়ে বড় বাজার শাসন করছে। এদেশে প্রায় ৫০ কোটিরও বেশি সক্রিয় হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারী রয়েছেন, যা টেলিগ্রাম বা সিগনালের চেয়ে বহুগুণ বেশি। স্বাভাবিকভাবেই এই বিপুল সংখ্যকভারতীয় নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও সাইবার সচেতনতাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে চাইছে প্রশাসন। অন্যদিকে টেলিগ্রাম এবং সিগনাল এই ফিচারটি দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করলেও এখন তাদেরও ভারতীয় কড়া আইনের সামনে কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে।
বিতর্কের মূল জায়গাটি হল ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা বনাম জাতীয় জননিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। হোয়াটসঅ্যাপের কর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন, তাদের এই ইউজারনেম ফিচারে আগে থেকেই যথেষ্ট সুরক্ষাকবচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোনওভাবে যাতে নকল আইডি তৈরির মাধ্যমে জালিয়াতির সুযোগ তৈরি না হয়, তার জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টগুলির ইউজারনেম আগে থেকেই প্ল্যাটফর্মটি সংরক্ষিত রাখবে, যাতে অন্য কেউ সেগুলোর উপর নিজের মালিকানা দাবি করতে না পারে।
মেসেজিং অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের বাড়তি স্তরের সুরক্ষার জন্য একটি চার সংখ্যার পিন কোড বা ‘ইউজারনেম কি’ ব্যবহারের অভিনব প্রস্তাব দিয়েছে। এর ফলে অপর কোনও ব্যক্তি যদি সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীর ইউজারনেম এবং পিন দুটোই সঠিকভাবে না জানেন, তবে তিনি কোনওভাবেই মেসেজ পাঠাতে পারবেন না। একই সঙ্গে, প্ল্যাটফর্মে কোনও ইউজারনেম খুঁজে নেওয়ার মতো কোনও গ্লোবাল ডিরেক্টরিও বা সার্চ করার ব্যবস্থা রাখা হবে না বলে হোয়াটসঅ্যাপ স্পষ্ট করেছে।
ইউজারনেম ব্যবস্থার আইনি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে দিল্লির ডিজিটাল অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত সংস্থা ‘ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন’ (আইএফএফ)। তাদের যুক্তি, দেশের প্রচলিত তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সরকারের এমন কোনো ক্ষমতা নেই যা দিয়ে কোনো ফিচারের চালুর আগেই তা বন্ধ করা বা নিরীক্ষা করা যায়। আইএফএফ-এর মতে, প্রযুক্তি বা ফিচারের পথ রোধ না করে বরং মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ অবশ্য মনে করেন, ব্যক্তিগত ফোন নম্বর আড়াল করা গেলে ‘সিম-সোয়াপিং’ (SIM-swap) জালিয়াতি মারাত্মকভাবে কমানো সম্ভব। অপরাধীরা কোনও ব্যক্তির মোবাইল নম্বরের নকল ক্লোন বানিয়ে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা করে দেওয়ার মতো ঘটনা এখন নিত্যদিন ঘটাচ্ছে। ইউজারনেম ব্যবস্থা কার্যকর হলে সাইবার অপরাধীরা সহজেই মানুষের ব্যক্তিগত নম্বর এবং অন্যান্য গোপন আর্থিক তথ্য হাতাতে পারবে না, যা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বড় এক স্বস্তি।
টেলিগ্রাম অবশ্য এর আগেও ভারতে সরকারি তদন্তকারীদের কঠোর নজরে ছিল। দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষার (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিতর্কের সময় ভারতের সার্বভৌমত্ব ও তথ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই চ্যাট অ্যাপটির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিয়েছিল প্রশাসন। পরীক্ষা প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা রক্ষায় কিছু বিতর্কিত ঘটনার পর সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়তে হয়েছিল প্ল্যাটফর্মটিকে।
নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির অগ্রগতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ভারতীয় সাইবার কূটনীতির মূল ফোকাস। ইউজারনেম বা ফোন নম্বর গোপন করার সুবিধা আধুনিক ইন্টারনেটে জনপ্রিয় হলেও তা কোনওভাবেই যাতে অপরাধীদের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে চাইছে সরকার। হোয়াটসঅ্যাপের পর সিগনাল এবং টেলিগ্রামের এই নোটিশের জবাব অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছেন দেশের সাইবার গবেষকরা।



Post Comment