পুজোর মুখে অনেক রোজগার, ভিনরাজ্য থেকে আসছে লোক, রাতারাতি ভাগ্য বদলাচ্ছে নারায়ণগড়-কেশিয়াড়ির মহিলাদের
Last Updated:
পুজোর মুখে সংসারে বাড়তি আয়ের আশায় বুনো কাশঘাস দিয়ে ঝাঁটা তৈরি করে বিক্রি করছেন নারায়ণগড় ও কেশিয়াড়ির বহু মহিলা। এই ছোট উদ্যোগই তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছে বিকল্প আয়ের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
মেদিনীপুর, রঞ্জন চন্দ: শারদোৎসবের মুখে চারপাশ যখন কাশফুলের দোলায় সেজে উঠছে, তখনই একমুঠো অন্নের সন্ধানে জঙ্গলমহলের বুকে শুরু হয়েছে জীবনের আরেক লড়াই। মণ্ডপে মণ্ডপে যখন মৃন্ময়ী দশভূজার আবাহনে প্রস্তুতি তুঙ্গে, তখন পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত জনপদের রক্তমাংসে গড়া দুর্গতরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেমে পড়েছেন প্রকৃতির বুক থেকে রুজি-রুটি ছিনিয়ে আনার কাজে। বর্ষার শেষে বছরের এই নির্দিষ্ট একটি মাসই তাঁদের কাছে বাড়তি আয়ের একমাত্র অবলম্বন। বিষধর সাপের ফোঁসফোঁসানি বা রক্তচোষা জোঁকের ভয়কে একপাশে সরিয়ে রেখে সাতসকালে তাঁরা পা বাড়ান গহিন জঙ্গল আর জল-কাদার দিকে। লক্ষ্য একটাই— একরাশ লম্বা কাশঘাস কেটে এনে ঘরের অন্নের সংস্থান করা।
পশ্চিম মেদিনীপুরের নারায়ণগড়, কেশিয়াড়ি-সহ সংলগ্ন ব্লকের আদিবাসী পরিবারের মহিলারা বংশপরম্পরায় এই সময়টিতে নেমে পড়েন মাঠে-ঘাটে। বর্ষার বিদায়বেলায় পুকুরের পাড়, খালের ধার কিংবা জলাজমিতে কাশ ও বিশেষ প্রজাতির বুনো শক্ত ঘাসের বাড়বাড়ন্ত দেখা যায়। হাঁটু সমান কাদা আর ঘন কাঁটাঝোপ ঠেলে সেই লম্বা ঘাস সংগ্রহ করতে গিয়ে পদে পদে ওত পেতে থাকে প্রাণঘাতী বিপদ। তবুও পেটের তাগিদে সেই ভয়কে জয় করাই যেন তাঁদের দস্তুর। বাড়ি থেকে বহু দূরে গিয়ে সারা দিন ধরে ঘাস কেটে মাথায় করে বয়ে নিয়ে আসেন তাঁরা। প্রকৃতির বুকে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত পোকামাকড় বা বুনো জানোয়ারের আতঙ্কও হার মেনে যায় ঘরের অনটনের কাছে।
জঙ্গল থেকে কেটে আনা এই কাঁচা ঘাস প্রথমে কড়া রোদে বেশ কয়েক দিন শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর শক্ত কাঠি ও দড়ি দিয়ে নিখুঁত দক্ষতায় নিপুণ হাতে বেঁধে তৈরি হয় টেকসই ঝাড়ু বা ঘর পরিষ্কারের বিশেষ ঝাঁটা। নিজেদের সংসারের সারা বছরের ব্যবহারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি ঝাড়ুগুলো নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় হাটবাজারে। বাজারে প্রতিটি ঝাড়ু বিক্রি হয় গড়ে পঞ্চাশ টাকায়। পুজোর মুখে এক-একটি পরিবারের কাছে এই সামান্য ক’টা টাকাই হয়ে ওঠে পরম লক্ষ্মীলাভ। যেখানে সারা বছর রোজগারের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত, সেখানে এই বুনো ঘাস বিক্রি করেই সন্তানের মুখে পুষ্টিকর খাবার তুলে দেওয়া কিংবা পুজোর নতুন জামা কেনার স্বপ্ন দেখেন তাঁরা।
জীবনসংগ্রামের এমন অদম্য লড়াইকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। সামান্য প্রাকৃতিক সম্পদকে বিকল্প আয়ের দিশা বানিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর এই লড়াইয়ে তাঁরাই যেন বাস্তবের অসুরদলনী। পুজোর ঢাকের আওয়াজ যখন দূর থেকে ভেসে আসে, তখন মেঠো পথের ধারে বসে আপন মনে ঘাসের আঁটি বাঁধেন এই আদিবাসী মায়েরা। কোনও বড় সরকারি অনুদান বা সহায়তার অপেক্ষা না করে, নিজের বাহুবলে প্রতিকূলতাকে জয় করে বেঁচে থাকার এই লড়াই প্রমাণ করে— সমাজের আসল দুর্গা মণ্ডপের বেদিতে নয়, প্রকৃতির রুক্ষ জমিতে ঘাম ঝরিয়েই রোজ নিজের অস্তিত্বের জানান দেন।
Post Comment