নিট-ইউজি পরীক্ষার আগে ব্লকড টেলিগ্রাম, সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে মেসেজিং অ্যাপ সংস্থা

নিট-ইউজি পরীক্ষার আগে ব্লকড টেলিগ্রাম, সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে মেসেজিং অ্যাপ সংস্থা

India

-Ritesh Ghosh

আগামী ২১ জুনের নিট-ইউজি (NEET-UG) রি-টেস্ট বা পুনঃপরীক্ষার ঠিক আগে কেন্দ্রীয় সরকারের জারি করা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা চ্যালেঞ্জ করে আদালতের দ্বারস্থ হল বার্তা আদান-প্রদানকারী জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রাম। দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি তেজস কারিয়ার এজলাসে এই জরুরি আবেদন জানানো হয়েছে। আদালত আবেদনটি খতিয়ে দেখতে এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত শুনানি করতে সহমত প্রকাশ করেছে। সরকারের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে অবিলম্বে আইনি স্বস্তি চেয়েছে মেসেজিং সংস্থাটি।

গত মে মাসের ৩ তারিখে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি প্রবেশিকা পরীক্ষায় দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল কেন্দ্র। সেই ধাক্কা সামলে আগামী ২১ জুনের নতুন পরীক্ষা যাতে স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করা যায়, তার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ এবং উচ্চশিক্ষা বিভাগের সুপারিশে টেলিগ্রাম সামগ্রিকভাবে ব্লক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক।

Alert notification screen blocking the Telegram app

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ২০০০ সালের আইনের ৬৯এ ধারার আওতায় এই কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, আগামী ২২ জুন পর্যন্ত ভারতে টেলিগ্রামের কার্যকারিতা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে। কেন্দ্রের এই সামগ্রিক পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য পরীক্ষার সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের নামে চলা বিভিন্ন অসাধু চক্র, জালিয়াতি এবং ভুয়ো তথ্যের অবাধ বিস্তার রোধ করা।

এনটিএ-এর ডিরেক্টর জেনারেল अभिषेक সিং জানিয়েছেন, আসন্ন পরীক্ষা যাতে কোনও ধরনের গরমিল এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াই সুষ্ঠু উপায়ে সম্পন্ন করা যায়, তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পরীক্ষা ব্যবস্থা স্বচ্ছ রাখতে সম্ভাব্য সমস্ত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা তারা নিতে প্রস্তুত। কোনও অপরাধচক্র যাতে পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করতে না পারে, সেজন্যই এমন কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি স্পষ্ট করে বলেছে যে, বর্তমানে কোনও নিশ্চিত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি। প্রকৃতপক্ষে ইন্টারনেটে পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হওয়া ভীতি ও মানসিক উদ্বেগ দূর করতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জালিয়াতি চক্রগুলি বিভিন্ন ভুয়ো নাম ও চ্যানেল ব্যবহার করে অনলাইনে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে এবং আসল প্রশ্ন দেওয়ার ফাঁদ পেতে টাকা হাতানোর চেষ্টা করছে।

গোয়েন্দা সূত্রের খবর, টেলিগ্রামে ‘পেপার লিকড নিট’, ‘রি-নিট ২০২৬’ বা ‘প্রাইভেট মাফিয়া’ এর মতো নাম দিয়ে একাধিক গ্রুপ খোলা হয়েছিল। এই সমস্ত গ্রুপ খুলে কয়েক হাজার থেকে শুরু করে লক্ষ লক্ষ টাকা দাবি করা হচ্ছিল আসল প্রশ্ন এনে দেওয়ার নামে। পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মানসিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছিল বিপুল অর্থ।

শুধুমাত্র সামগ্রিকভাবে অ্যাপ ব্লক করাই নয়, বিতর্কিত বার্তা সম্পাদনা বা মেসেজ এডিটিং ফিচারের ওপরও কড়া নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে। নির্দেশানুযায়ী আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত ভারতে টেলিগ্রামের আগে পাঠানো বার্তা এডিটের সুবিধা নিষ্ক্রিয় থাকবে। এনটিএ-এর আশঙ্কা, প্রতারকেরা পরীক্ষা শেষের পর পুরনো পোস্টে প্রশ্নপত্রের ছবি জুড়ে টাইমস্ট্যাম্প পরিবর্তন করে ভুয়া প্রমাণ বানাতে পারত।

এই কৌশলের দ্বারা প্রতারকেরা সফলভাবে মিথ্যা দাবি ছড়াত যে পরীক্ষা শুরুর অনেক আগেই প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন ভুয়া স্ক্রিনশট দেখিয়ে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়ানোর সম্ভাবনা আটকানোই কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য। ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার (আই৪সি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে রাজ্য পুলিশের সাথে সম্মিলিত উদ্যোগে বড় ধরনের সাইবার অপরাধ দমনে কাজ করে চলেছে।

তদন্তকারীদের মতে, পূর্ববর্তী কিছু পরীক্ষায় প্রতারকেরা এই কারিগরি ফাঁকফোকরের অপব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। এইবার সেই সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে তথ্য বিকৃতির রাস্তা অবরুদ্ধ করেছে সরকার। এই সিদ্ধান্ত সাধারণ ব্যবহারকারীদের সাময়িকভাবে সমস্যায় ফেললেও পরীক্ষার সার্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার স্বার্থে এটি অত্যন্ত জরুরি ছিল বলে প্রশাসনের তরফ থেকে গুরুত্ব সহকারে জানানো হয়েছে।

সরকারের এই অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন টেলিগ্রামের প্রধান নির্বাহী পাভেল দুরভ। সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ এক পোস্টে তিনি সরকারের এই পদক্ষেপকে একটি বড় ভুল বলে আখ্যা দেন। তাঁর মতে, মুষ্টিমেয় কিছু প্রতারকের অন্যায় কাজের জন্য ভারতের ১৫ কোটিরও বেশি সাধারণ ও নিরপরাধ ব্যবহারকারীকে প্রয়োজনীয় এই ডিজিটাল মাধ্যম থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

দুর্নীতি রুখতে টেলিগ্রাম সবসময় সচেষ্ট বলে দাবি করেছেন সিইও পাভেল দুরভ। সাম্প্রতিক সপ্তাহে পরীক্ষা সংক্রান্ত জালিয়াতিতে জড়িত শত শত চ্যানেল তারা বন্ধ করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। অ্যাপ ব্লক করাকে ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (আইএফএফ)-এর মতো অধিকার সংগঠনগুলিও একটি অপরিপক্ক ও সাময়িক সমাধান বলে সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, এতে মূল সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান মিলবে না।

গত ৯ জুন বিহার পুলিশের অর্থনৈতিক অপরাধ শাখা নিট পরীক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিল। এছাড়া আমদাবাদ সাইবার ক্রাইম বিভাগ সম্প্রতি একটি বড় চক্রের খোঁজ পায়। যারা টেলিগ্রামের ৮টি চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকার ভুয়া লেনদেন সম্পন্ন করে। এক মাসে এক হাজারের কাছাকাছি মোবাইল নম্বরের সাথে তারা যোগাযোগ করেছিল। বর্তমানে বিভিন্ন রাজ্যে এই অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

আইনি বিতর্ক ও দিল্লি হাইকোর্টের শুনানি চলমান থাকলেও আগামী ২১ জুনের নিট-ইউজি পুনঃপরীক্ষার সময়সূচিতে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না। এনটিএ পরীক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে সমস্ত অফিসিয়াল নির্দেশিকা নজর রাখতে অনুরোধ করেছে। সাময়িক প্ল্যাটফর্ম বিভ্রাট হলেও অসদুপায় অবলম্বনকারী ও গুজবের হাত থেকে বাঁচতে প্রার্থীদের সচেতন থাকাই এই মুহূর্তে সরকারের একমাত্র কাম্য।

Post Comment

You May Have Missed