চন্দ্রিমার ইস্তফায় দলের রাশ নিজের হাতে নিলেন মমতা, ডেপুটি করলেন মদন-কুণালকে

চন্দ্রিমার ইস্তফায় দলের রাশ নিজের হাতে নিলেন মমতা, ডেপুটি করলেন মদন-কুণালকে

Kolkata

-Ritesh Ghosh

তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য স্তরের সাংগঠনিক সমীকরণে একের পর এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে চলেছে। রাজনৈতিক মহলে কালীঘাটের সিদ্ধান্ত ঘিরে জোর শোরগোল শুরু হয়েছে। দলের অন্দরের আচমকা অস্থিরতার মাঝে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে রাজ্য সভানেত্রীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। আর এই উদ্ভূত সাংগঠনিক সংকট সামলাতে নিজেই একেবারে প্রথম সারিতে নেমে পড়লেন কালীঘাট তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

শনিবার সরাসরি কালীঘাটের দলীয় কার্যালয় থেকে ফেসবুক লাইভ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক বড় ঘোষণা করেন। চন্দ্রিমার পদত্যাগের পর দলের রাজ্য সংগঠনের সমস্ত দায়িত্ব নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞ কাঁধেই তুলে নিলেন তিনি। মমতা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, এখন থেকে রাজ্য সংগঠন তিনিই নিজে সরাসরি তদারকি করবেন এবং দলের সমস্ত স্তরের কাজ তাঁর কড়া নজরদারিতেই সম্পন্ন হবে।

Mamata Banerjee addresses leadership changes within TMC organization

তৃণমূলনেত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “কে দল বা পদ ছেড়ে চলে গেল, তাতে আমার বা দলের বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না। আমার বড় বড় নেতার প্রয়োজন নেই, আমি তৃণমূল স্তরের সাধারণ কর্মীদের কাছে টেনে নিয়ে দলের সংগঠন তৈরি করতে চাই।” তিনি আরও যোগ করেন, সাধারণত তিনি প্রতিদিন পার্টি অফিসে বসেন এবং কর্মীদের সঙ্গে দেখা করেন। এবার থেকে সেই সময় আরও বাড়িয়ে দেবেন।

মেট্রোপলিটন কার্যালয় বিতর্ক ও চন্দ্রিমার পদত্যাগ

তৃণমূলের অন্দরে এই চরম অস্বস্তিকর ডামাডোলের সূত্রপাত ঘটেছিল শুক্রবার বিকেলের দিকে। কলকাতার মেট্রোপলিটন এলাকায় তৃণমূলের কার্যালয় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা দখল করে নেন বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় স্তরে রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সহায়তায় কার্যালয়ের প্রধান প্রবেশদ্বারে বড় আকারের তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় কালীঘাট শিবিরের দলীয় সম্মান ও শৃঙ্খলা নিয়ে নানা মহলে কড়া প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যখন এই আকস্মিক দখলদারির ঘটনা ঘটেছিল, তখন সেই ভবনে স্বয়ং রাজ্য সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু কার্যালয় হাতছাড়া হওয়া সত্ত্বেও প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর কোনও সক্রিয় ভূমিকা সেখানে লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ এই অপ্রীতিকর খবর পাওয়ামাত্রই দলের দুই প্রথম সারির লড়াকু নেতা কুণাল ঘোষ এবং মদন মিত্র দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন।

দলের কার্যালয় পুনরুদ্ধারে কুণাল এবং মদন শুধু সশরীরে উপস্থিতই থাকেননি, গভীর রাত পর্যন্ত থানায় অবস্থান করেন। থানায় এই কার্যালয় দখলদারির বিরুদ্ধে তাঁরা একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগও দায়ের করেন। রাতে সমগ্র ঘটনা বিস্তারিতভাবে শোনেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের এই রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তার কারণ জানতে চান এবং সরাসরি তাঁকে প্রশ্ন করেন।

দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই কড়া জবাবদিহি চাওয়ার পর তা নিজের রাজনৈতিক আত্মসম্মানে আঘাত বলে মনে করেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। অভিযোগ, অত্যন্ত ক্ষুব্ধ এবং অভিমানী হয়ে শনিবার দুপুরে তিনি প্রথমে বিধানসভায় গিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের সঙ্গে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এর ঠিক পরেই তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের তাঁর সমস্ত রকমের দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।

মদন ও কুণালের কাঁধে নতুন বড় সাংগঠনিক দায়িত্ব

রাজ্য সংগঠনের এই বড় ধাক্কা সামলাতে দলনেত্রীর কাজের সুবিধার জন্য দুটি নতুন পদের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। সাংগঠনিক শক্তিকে সংহত করতে কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র ও বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষকে রাজ্য তৃণমূলের নতুন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনোনীত করলেন কালীঘাট তৃণমূলনেত্রী। মূলত মমতাকে দল পরিচালনায় সহায়ক শক্তি হিসেবে সাহায্য করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মদন মিত্র ইতিমধ্যে দলের দমদম সাংগঠনিক জেলা সভাপতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। নতুন এই পদোন্নতির ফলে তাঁর কাজের দিগন্ত আরও বৃদ্ধি পেল। অন্যদিকে, বিগত দিনে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কুণাল ঘোষ যেভাবে বারবার দলের হয়ে ময়দানে সোচ্চার হয়েছেন, রাজ্য রাজনীতিতে তার পুরস্কার হিসেবেই সুপ্রিমো তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা প্রদর্শন করলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নেতার নাম নতুন নির্ধারিত দায়িত্ব অতিরিক্ত বা পূর্ববর্তী পদ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কালীঘাট তৃণমূলের রাজ্য সংগঠনের প্রধান চালিকাশক্তি সর্বভারতীয় কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো
মদন মিত্র রাজ্য কালীঘাট তৃণমূলের নবনিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক কামারহাটির বিধায়ক ও দমদম জেলা সভাপতি
কুণাল ঘোষ রাজ্য কালীঘাট তৃণমূলের নবনিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক বেলেঘাটার বিধায়ক ও রাজ্য মুখপাত্র

এই নতুন এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের মাধ্যমে তৃণমূলনেত্রী আদতে এক ঢিলে দুই পাখি মারলেন বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। একদিকে যেমন বিরোধী বা নিষ্ক্রিয় মনোভাবাপন্ন নেতাদের জন্য কড়া বার্তা পাঠানো সম্পন্ন হলো, তেমনই অন্যদিকে অনুগত কর্মীদের যথাযোগ্য মযার্দা দিয়ে তৃণমূলের শিকড় মজবুত করার প্রয়াস নেওয়া হল। লোকসভা নির্বাচনের আগে সংগঠনকে মসৃণ রাখতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দৃঢ় পদক্ষেপ।

দলের ভিতরের এই অপ্রত্যাশিত ঝোড়ো পরিস্থিতি আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রকে কোন অভিমুখে নিয়ে যায়, তা অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। সমস্ত জল্পনার ঊর্ধ্বে উঠে দলের সুপ্রিমো নিজেই সরাসরি সেনাপতির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় সাধারণ কর্মীদের মনোবল আরও বৃদ্ধি পাবে বলেই আশা করা হচ্ছে। এই নতুন অধ্যায়ের সূচনার পর কালীঘাট তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংহতি কতটা সুদৃঢ় হয়, এখন রাজ্য রাজনীতির বড় চর্চার বিষয় সেটাই।

Post Comment

You May Have Missed