আদানি গ্রিনের নতুন রেকর্ড! ভারতের প্রথম কোম্পানি হিসেবে ২০ গিগাওয়াটের মাইলফলক স্পর্শ
India
-Ritesh Ghosh
ভারতের গ্রিন পাওয়ার সেক্টরের ইতিহাসে এক বড়সড় মাইলফলক স্পর্শ করল আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেড (এজিইএল)। দেশের প্রথম কোনও নবীকরণযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনকারী সংস্থা হিসেবে তারা ২০ গিগাওয়াট বা ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা সম্পন্ন প্রোজেক্ট সফলভাবে চালু করেছে। মূলত সম্পূর্ণ নতুন প্রকল্প বা গ্রিনফিল্ড প্রকল্পের বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন করেছে আদানি গোষ্ঠী।
আদানি গ্রিন এনার্জির এই নতুন অর্জন ভারতের সামগ্রিক নবীকরণযোগ্য শক্তির বাজারে তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করল। বর্তমানে দেশের মোট গ্রিড-স্কেল সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ১৪ শতাংশ এবং সম্মিলিত বায়ু ও সৌর বিদ্যুৎ ক্ষমতার প্রায় ১২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এই একক সংস্থা। দেশের ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা মেটাতে এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতিতে এই সাফল্য বড় প্রভাব ফেলবে।

আদানি গোষ্ঠীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের বর্তমান প্রকল্পগুলি থেকে প্রতি বছর ৫২ বিলিয়ন ইউনিটের বেশি পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এই বিপুল শক্তি ভারতের মোট বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। সহজভাবে বললে, এই বিদ্যুৎ দিয়ে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরের মোট বার্ষিক চাহিদা অথবা ভারতের মুম্বই ও দিল্লির সম্মিলিত এক বছরের বিদ্যুৎ চাহিদা অনায়াসে মেটানো সম্ভব।
২০ গিগাওয়াটের এই মাইলফলক স্পর্শ করতে আদানি গ্রিন এনার্জির প্রায় এক দশক সময় লেগেছে। ২০১৬ সালে তামিলনাড়ুর কামুথিতে এজিইএল তাদের প্রথম বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করেছিল। এরপর থেকে ধাপে ধাপে তারা নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। বিশেষ করে ২০২৬ অর্থবর্ষে সংস্থাটি তাদের পোর্টফোলিওতে নতুন করে ৫,০৫১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্ষমতা যুক্ত করেছে, যা চিনের বাইরে যেকোনও একক সংস্থার জন্য বার্ষিক সর্বোচ্চ অর্জন।
এই অনন্য সাফল্য নিয়ে আদানি গ্রিন এনার্জির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সাগর আদানি নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ২০ গিগাওয়াটের গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে সুশৃঙ্খল কর্মপরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি কী করতে পারে। আমাদের দক্ষ দল এবং পার্টনারদের যৌথ প্রচেষ্টায় আজ আমরা মুম্বই ও দিল্লির সম্মিলিত বার্ষিক চাহিদার সমান পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করছি, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করছে।
আদানি গ্রিন এনার্জির ২০ গিগাওয়াটের কার্যক্ষম পোর্টফোলিওতে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ খাতের এক চমৎকার ভারসাম্য লক্ষ্য করা গিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৪.২ গিগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ, ২.৭ গিগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ এবং ৩.৩ গিগাওয়াট উইন্ড-সোলার বা বায়ু-সৌর হাইব্রিড প্রকল্প রয়েছে। শক্তির এই বৈচিত্র্য দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দারুণ সাহায্য করছে।
শুধু উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিই নয়, উৎপাদিত শক্তির গুণগত সঞ্চয়ের জন্য ব্যাটারি প্রযুক্তির উপরেও বিশেষ জোর দিয়েছে এই সংস্থা। এখনও পর্যন্ত তারা ৩.৫৫ গিগাওয়াট-ঘণ্টা (জিডাব্লিউএইচ) ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) স্থাপন করেছে, যা চিনের বাইরে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ব্যাটারি স্টোরেজ প্রকল্প। আগামী ২০২৭ অর্থবর্ষে এই ক্ষেত্রে আরও ১০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা ব্যাটারি স্টোরেজ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে আদানির।
গুজরাতের কচ্ছ জেলায় অবস্থিত খাবড়া রিনিউয়েবল এনার্জি পার্কটি আদানি গ্রিন এনার্জির মূল চালিকাশক্তি হতে চলেছে। প্রায় ৫৩৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল পার্কটি বিশ্বের বৃহত্তম নবীকরণযোগ্য শক্তি প্রকল্প হতে চলেছে যার মোট পরিকল্পিত ক্ষমতা ৩০ গিগাওয়াট। ইতিমধ্যেই এই স্থানে আদানি গ্রিন প্রায় ৯.৫ গিগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সফলভাবে শুরু করে দিয়েছে যা মোট পরিকল্পনার ৩০ শতাংশের বেশি।
খাবড়া প্রকল্পের দ্রুত অগ্রগতি সংস্থার ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রাকে অনেকটাই মজবুত করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কোম্পানিটির প্রধান উদ্দেশ্য হল তাদের সামগ্রিক নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে ৫০ গিগাওয়াটে নিয়ে যাওয়া। এর অংশ হিসাবে আগামী পাঁচ বছরে তারা নিজেদের মোট ব্যাটারি স্টোরেজ পোর্টফোলিও বাড়িয়ে ৫০ গিগাওয়াট-ঘণ্টায় উন্নীত করার বিশাল রূপরেখা তৈরি করেছে, যা বিদ্যুৎ সেক্টরের পুরো চিত্র বদলে দেবে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধে আদানি গ্রিনের এই ২০ গিগাওয়াটের ক্ষমতা এক বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর এই প্রকল্পগুলি থেকে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ তৈরির কারণে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন টনেরও বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস পাচ্ছে। এটি ভারতের সড়ক থেকে বাৎসরিক প্রায় ৮১ লক্ষ পেট্রোল-ডিজেল চালিত গাড়ি স্থায়ীভাবে তুলে নেওয়ার সমতুল্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে ভারতের ১২টি ভিন্ন রাজ্যে বিস্তৃত রয়েছে আদানি গ্রিন এনার্জির বিভিন্ন বড় মাপের প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলি বার্ষিক প্রায় ৯০ লক্ষেরও বেশি ভারতীয় পরিবারকে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। বিশাল এই প্রকল্প পরিকাঠামো স্থানীয় অর্থনীতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছে এবং সেই সব অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষের আর্থিক মানোন্নয়ন ঘটাতে সাহায্য করছে।
ভারতের ২০৭০ সালের মধ্যে নেট-জিরো কার্বন নিঃসরণের প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলির এমন পরিকল্পিত উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। আদানি গ্রিনের মতো সংস্থার ধারাবাহিক শক্তির এই অগ্রযাত্রা ভারতের গ্রিন এনার্জির লক্ষ্যমাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করবে। দেশের শক্তি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন করানোর পাশাপাশি আধুনিক পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে এই মাইলফলক আগামী দিনে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।



Post Comment