অনশন নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত জানালেন সোনম ওয়াংচুক! ২০ জুলাই কি বদলাবে ভাগ্য?

India

-Ritesh Ghosh

নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে দীর্ঘ ২০ দিন ধরে আমরণ অনশনে বসা দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক অবশেষে তাঁর অনশন ভাঙার নির্দিষ্ট দিন ঘোষণা করেছেন। আগামী ২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা চূড়ান্ত হতে চলেছে। ওই দিন প্রস্তাবিত বিরোধী রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির সংসদ মিছিলে সশরীরে অংশ নেওয়ার পরেই তিনি এই আমরণ অনশন সমাপ্ত করবেন বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন।

সোনম ওয়াংচুকের এই আন্দোলন মূলত দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ওঠা একাধিক অনিয়ম ও অসঙ্গতির প্রতিবাদে শুরু হয়েছিল। তাঁর প্রধান দাবি হল, শিক্ষাক্ষেত্রের এই অনিয়মের নৈতিক দায় স্বীকার করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে ইস্তফা দিতে হবে। এই দাবিকে সামনে রেখেই দীর্ঘ ২৮ দিন ধরে দিল্লির বুকে অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি বা সংক্ষেপে সিজেপি।

Sonam Wangchuk during hunger strike at Jantar Mantar

যন্তর মন্তরের সভামঞ্চে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখার সময় সোনম ওয়াংচুক জানিয়েছেন যে, ২০ জুলাই এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। ওই দিন সংসদ চলো অভিযানের ডাক দিয়ে তিনি রসিকতার ছলে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ২০ জুলাইয়ের এই পদযাত্রা যদি সফল না হয় তবে তিনি ‘ভূত হয়ে ফিরে আসবেন’।

সমাজকর্মী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, শুধু দূর থেকে সহানুভূতি প্রকাশ করে কোনও গণ আন্দোলনে জয় আনা সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক এক ভিডিও বার্তায় তিনি তাঁর অনুগামীদের উদ্দেশে আবেগঘন সুরে বলেন, দয়া করে কেউ আমাকে ব্যক্তিগতভাবে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানাবেন না, কারণ সরকারের কাছ থেকে কোনও সদুত্তর না পেয়ে আন্দোলন তুলে নিলে তা ভুল বার্তা দেবে। বরং অনশন ভাঙানোর চেষ্টার চেয়ে বেশি জরুরি হল আগামী ২০ জুলাইয়ের মিছিলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হওয়া।

শারীরিক অবস্থার অবনতি ও দিল্লি হাইকোর্টের জরুরি নজরদারি

অনশনের তিন সপ্তাহে পদার্পণ করার পর সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি ঘটছে বলে চিকিৎসকদের রিপোর্টে জানা গিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে প্রকাশিত একটি চিকিৎসাগত বুলেটিন অনুযায়ী, অনশন শুরু করার পর থেকে তাঁর শরীরের ওজন প্রায় ৯ কেজি কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬.৬৫ কেজিতে। গত ২৪ ঘণ্টাতেই তাঁর ওজন কমেছে প্রায় ৫০০ গ্রাম। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে, তাঁর মানসিক সচেতনতা স্বাভাবিক থাকলেও শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর অনশনের প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।

মেডিক্যাল রিপোর্ট অনুযায়ী, ওয়াংচুকের সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ আপাতত ১০৫/৬১ এমএমএইচজি এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ ৮০ মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটারে নেমে এসেছে। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৯৭ শতাংশ থাকলেও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁকে সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দিল্লির চরম আবহাওয়ার মধ্যে খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘক্ষণ থাকা তাঁর স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন।

আমরণ অনশনের জেরে ওয়াংচুকের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দিল্লি হাইকোর্টও। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সম্প্রতি একটি পিটিশন শুনানির ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও দিল্লি সরকারকে সমাজকর্মীর স্বাস্থ্যের উপর দৈনিক ভিত্তিতে নজরদারি চালানোর কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি তাঁর শারীরিক অবস্থা জীবনহানির স্তরে পৌঁছয়, তবে সরকারকে তৎক্ষণাৎ উপযুক্ত চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে বলা হয়েছে। এই নির্দেশের ভিত্তিতে কেন্দ্র আশ্বস্ত করেছে যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে তারা প্রস্তুত।

ব্যঙ্গাত্মক কর্মসূচি থেকে মূল ধারার বৃহত্তম রাজনৈতিক প্রতিরোধ

ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র এই আন্দোলন দিল্লির বুকে ঠিক কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা বেশ অভিনব ও চমকপ্রদ। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্যকান্ত একটি মামলার শুনানিতে দেশের বেকার ও বিপন্ন যুব সম্প্রদায়কে ‘তেলাপোকা’ বা ‘পরজীবী’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তাঁর সেই অবমাননাকর মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করার পর বিদেশে গবেষণারত ভারতীয় যুবক অভিজিৎ দিপকে এই রূপক রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম দেন, যা প্রথম দিকে ছাত্র ও যুবদের কাছে এক তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ ছিল।

শুরুতে কেবল একটি ডিজিটাল প্রতিবাদ এবং ব্যঙ্গাত্মক প্রচার হিসেবে দেখা গেলেও, সোনম ওয়াংচুক এই আন্দোলনের সমর্থনে আমরণ অনশনে বসার সাথে সাথেই সমীকরণ এক ধাক্কায় বদলে যায়। তাঁর ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থান ও কৃচ্ছ্রসাধনের আত্মত্যাগ এই আন্দোলনকে গভীর মর্যাদা যোগায়। এরপর থেকে বিরোধী শিবিরের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, দেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় লেখক, স্বনামধন্য সমাজকর্মী ও শিল্পকলা জগতের ব্যক্তিরা স্বপ্রণোদিত হয়ে যন্তর মন্তরে এসে সংহতি জানাতে শুরু করেন।

আন্দোলনের এই ব্যাপক গতিপ্রকৃতি বদলের নেপথ্যে ওয়াংচুক নিজের ত্যাগের থেকেও বেশি কৃতিত্ব দিতে চান ভারতের যুব শক্তিকে। তিনি মনে করেন না যে, এই প্রতিবাদ কেবল তাঁর একার দাবির লড়াই। আজ যন্তর মন্তরে যাঁরা জড়ো হচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশই দেশের প্রান্তিক শিক্ষাক্ষেত্রে চলা দুর্নীতি, অনিয়ম ও সরকারি উদাসীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে আসছেন। এই সার্বিক নাগরিক অসন্তোষকেই তিনি গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

আন্দোলনরত সোনম ওয়াংচুকের জন্য আগামী ২০ জুলাইয়ের সংসদ পদযাত্রাই হবে সেই বড় অগ্নিপরীক্ষা, যা নির্ধারণ করবে এই সম্মিলিত প্রতিরোধের মূল গন্তব্য। বর্ষাকালীন অধিবেশনের সূচনার সাথেই দেশের রাজপথে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি এই আন্দোলনের নৈতিক ও বাস্তবিক জয় ঘোষণা করবে। যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়া হাজার হাজার আন্দোলনকারী এখন সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষায় রয়েছেন, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা বদলে দিতে সহায়ক হতে পারে।

Previous post

বাঁকুড়ার মেজিয়ায় নতুন স্টিল কারখানার শিলান্যাস মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর! বিপুল কর্মসংস্থানের ঘোষণা

Next post

ফ্রিল্যান্সার, গিগ কর্মী থেকে অসংরক্ষিত ক্ষেত্রের কর্মীদের জন্য বড় সুখবর! এবার পিএফের সুবিধা পাবেন সকলে

Post Comment

You May Have Missed