Suvendu Adhikari: ঠিক কাদের বলা হবে ‘গুন্ডা’..আছে সংজ্ঞা! যোগীর উত্তরপ্রদেশের আইনের সঙ্গে কোথায় মিল পশ্চিমবঙ্গের বিলের?

Suvendu Adhikari: ঠিক কাদের বলা হবে ‘গুন্ডা’..আছে সংজ্ঞা! যোগীর উত্তরপ্রদেশের আইনের সঙ্গে কোথায় মিল পশ্চিমবঙ্গের বিলের?

‘গুন্ডা দমন বিল’ নামে পরিচিত এই আইনটি ২০২৬ সালের ২৯ জুন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ১৭৬-৪১ ভোটে পাশ হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার এই বিলটি আনে। সরকারের দাবি, রাজনৈতিক হিংসা ও সিন্ডিকেট-রাজ নির্মূল করাই এই আইনের মূল লক্ষ্য। উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট ও মহারাষ্ট্রের কঠোর অ্যান্টি-গ্যাং আইনের ধাঁচে এই আইনটি তৈরি করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য

১. প্রতিরোধমূলক আটক

এই আইনের মাধ্যমে রাজ্য সরকার, জেলা শাসক (District Magistrate) অথবা পুলিশ কমিশনার কোনও ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক হেফাজতে (Preventive Detention) রাখতে পারবেন।

কোনও ব্যক্তি মুক্তি পাওয়ার পরে আবার সমাজবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত বলে অভিযোগ উঠলে, তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে আরও ১২ মাসের আটকাদেশ জারি করা যাবে।

প্রাথমিক আটকাদেশ ১৫ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এরপর রাজ্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। আটকাদেশ জারির তিন সপ্তাহের মধ্যে একজন কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত একটি ‘অ্যাডভাইজরি বোর্ড’ আটকাদেশের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করবে।

২. ‘গুন্ডা’-র বিস্তৃত সংজ্ঞা

এই বিলে ‘গুন্ডা’ বা অভ্যাসগত অপরাধীর সংজ্ঞা শুধু সহিংস অপরাধীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। বরং যাঁরা নিয়মিতভাবে অপরাধ সংঘটিত করেন, অপরাধচক্র পরিচালনা করেন, উৎসাহ দেন বা অর্থ জোগান, তাঁদেরও এই সংজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছেন—

* ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১১১ বা ১১২ ধারায় সংগঠিত অপরাধে চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তি।

* অস্ত্র আইন (Arms Act), বিস্ফোরক পদার্থ আইন (Explosive Substances Act) এবং এনডিপিএস (NDPS) আইনের পুনরাবৃত্ত অপরাধীরা।

* যাঁদের সাধারণভাবে সমাজের কাছে বিপজ্জনক ও আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত বলে মনে করা হয়।

৩. ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’-এর পরিধি বৃদ্ধি

এই আইনে জনশৃঙ্খলার জন্য কী ধরনের কাজকে হুমকি হিসেবে ধরা হবে, তার পরিধি অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে। ফলে কোনও অপরাধ এখনও না ঘটলেও, তা ঘটার সম্ভাবনা থাকলেই পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারবে।

আইনের আওতায় থাকবে—

* এমন কাজ, যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে বা মানুষের জীবন ও সম্পত্তির জন্য ব্যাপক বিপদ ডেকে আনে।

* বেআইনিভাবে সম্পত্তি দখল বা বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি।

* অবৈধ খনন, অনুমতি ছাড়া বালি তোলা, বন ও বন্যপ্রাণ সংক্রান্ত অপরাধের মতো অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অপরাধ, যার ফলে সরকারি কোষাগারের বড় ক্ষতি হয়।

৪. জেলা থেকে বহিষ্কার (Externment) ও পুলিশের বিশেষ ক্ষমতা

জেলা শাসক এবং পুলিশ কমিশনার কোনও সন্দেহভাজন ‘গুন্ডা’-কে জনশান্তির জন্য হুমকি মনে করলে নির্দিষ্ট জেলা বা এলাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২ মাসের জন্য বহিষ্কার (Externment) করতে পারবেন।

এই আইনের অধীন সমস্ত অপরাধকে আমলযোগ্য (Cognisable) এবং অজামিনযোগ্য (Non-bailable) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে পুলিশ পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, গ্রেফতার এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে।

এছাড়া, আটকাদেশ বা বহিষ্কার এড়িয়ে পালিয়ে যাওয়া কোনও ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া, লুকিয়ে রাখা বা সাহায্য করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে।

৫. সম্পত্তি নিলাম ও ক্ষতিপূরণ আদায়

এই বিলের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ জনশৃঙ্খলা রক্ষা (সংশোধনী) বিল, ২০২৬-ও পাশ হয়েছে।

এর ফলে দাঙ্গা বা বিক্ষোভের সময় সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হলে, অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলাম করে সেই ক্ষতির অর্থ আদায় করতে পারবে সরকার।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, বর্তমান আইনগুলিতে দাঙ্গাকারীদের আর্থিকভাবে জবাবদিহি করানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। নতুন আইন সেই ঘাটতি পূরণ করবে।

উত্তরপ্রদেশের আইনের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বিলের মিল

পশ্চিমবঙ্গ সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সংগঠিত অপরাধ, দাঙ্গা ও জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে উত্তরপ্রদেশের আইনের আদলেই এই আইন তৈরি করা হয়েছে।

সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও ক্ষতিপূরণ আদায়

উত্তরপ্রদেশে UP Recovery of Damage to Public and Private Property Act অনুযায়ী দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য অভিযুক্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলাম করা যায়।

একইভাবে পশ্চিমবঙ্গেও Maintenance of Public Order (Amendment) Bill, 2026-এর মাধ্যমে একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

প্রশাসনিক প্রক্রিয়া

উত্তরপ্রদেশে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তির জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বা প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে ‘ক্লেমস ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা হয়, যেখানে সাধারণ দেওয়ানি আদালতের ভূমিকা থাকে না।

পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের ‘ক্লেমস কমিশন’ গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কমিশনের আর্থিক মূল্যায়ন বা সিদ্ধান্তের ওপর সাধারণ আদালতের কোনও এখতিয়ার থাকবে না।

প্রতিরোধমূলক আটক

উত্তরপ্রদেশে ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (NSA)’ এবং ‘Uttar Pradesh Gangsters and Anti-Social Activities (Prevention) Act’-এর মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই বিচার ছাড়াই এক বছর পর্যন্ত আটক রাখার ক্ষমতা রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিলেও একইভাবে সন্দেহভাজন ‘গুন্ডা’-দের বিচার ছাড়াই সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখার বিধান রাখা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের পর্যালোচনার সময় আটক ব্যক্তির আইনজীবীর উপস্থিতিও সীমিত করা হয়েছে।

অপরাধচক্রের গোটা নেটওয়ার্ককে নিশানা

উত্তরপ্রদেশের গ্যাংস্টার আইনে শুধু অপরাধী নয়, তাঁকে অর্থ জোগানো, লুকিয়ে রাখা বা সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন আইনেও একইভাবে সিন্ডিকেট বা সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আশ্রয়দাতা, অর্থদাতা বা সহযোগীদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

জেলা থেকে বহিষ্কারের ক্ষমতা

উত্তরপ্রদেশের ‘UP Control of Goondas Act’-এ জেলা শাসকদের অভ্যাসগত অপরাধীদের নিজ জেলা থেকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন আইনেও জেলা শাসকদের একই ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে কোনও ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট জেলা বা অঞ্চল থেকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা যাবে।

Post Comment

You May Have Missed