‘স্যাটাভাঙা’ কেসে বিপাকে হুমায়ুন কবীর! বাড়ি বয়ে হাজিরার নোটিস দিয়ে এল পুলিশ

‘স্যাটাভাঙা’ কেসে বিপাকে হুমায়ুন কবীর! বাড়ি বয়ে হাজিরার নোটিস দিয়ে এল পুলিশ

West Bengal

-Ritesh Ghosh

মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের বিতর্কিত ও উস্কানিমূলক মন্তব্যের জেরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কঠোর পদক্ষেপ নিল পুলিশ প্রশাসন। মঙ্গলবার কাকভোরে রেজিনগঞ্জের বিধায়কের বাড়িতে পৌঁছে যায় বিশাল পুলিশ বাহিনী। তাঁর ওপর রুজু হওয়া দুটি পৃথক মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের স্বার্থে হুমায়ুন কবীরকে থানায় হাজিরার নোটিস পাঠানো হয়েছে। আগামী ৩ এবং ৫ জুলাই তাঁকে নির্দিষ্ট থানার তদন্তকারী আধিকারিকদের সামনে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি তাঁর একাধিক উস্কানিমূলক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের নতুন আইন ব্যবস্থা অর্থাৎ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা বিএনএস-এর বিভিন্ন কঠোর ধারায় পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলি নথিভুক্ত করেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, উস্কানিমূলক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে এমন যেকোনও মন্তব্যের ক্ষেত্রে প্রশাসনের এমন আপসহীন পদক্ষেপ সুশাসনের ক্ষেত্রে এক অন্য বার্তা দিচ্ছে। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর মনোভাব প্রকাশের পরেই তদন্ত প্রক্রিয়া অনন্য গতি পেয়েছে।

Police team serving legal notice at MLA residence

বিতর্কের মূল সূত্রপাত ঘটে গত শুক্রবার রেজিনগরের কাশীপুর এলাকার একটি স্থানীয় জনসভা থেকে। সেখানে বক্তব্য পেশ করার সময় হুমায়ুন কবীর অত্যন্ত কুরুচিকর ও প্ররোচনামূলক ভাষায় বিরোধী পক্ষের সমর্থকদের নিশানা করেন। তিনি বলেন, বিজেপি নির্বাচনে জিতে কেন্দ্রে সরকার গড়লেও মুর্শিদাবাদে তারা হেরেছে। এরপরই তিনি উস্কানিমূলক হুঙ্কার দিয়ে বলেন, তিনি নিজের বিপুল সংখ্যক সমর্থককে একজোট করে এমন প্রত্যাঘাত হানবেন যে প্রতিপক্ষের পালানোর কোনও রাস্তা থাকবে না।

এই প্রথম নয়, এর ঠিক পরবর্তী সময়ে শক্তিপুরের অপর একটি সমাবেশ থেকেও তিনি সরাসরি স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিষোদ্গার শুরু করেন। ভোটের ঠিক আগের দিন তাঁর নিজের ভাইপোকে নিয়মবহির্ভূতভাবে গ্রেফতার করার অভিযোগ করে স্থানীয় থানার ওসির তীব্র সমালোচনা করেন হুমায়ুন। সরাসরি সমাবেশ থেকে চিৎকার করে হুমায়ুন দাবি করেন, প্রায় ১০ হাজার মানুষ নিয়ে তিনি থানার চারপাশ ঘেরাও করবেন এবং তাঁর আত্মীয়কে নিজেদের ক্ষমতায় থানা থেকে বের করে নিয়ে আসবেন। ক্ষমতা থাকলে প্রশাসনকে তা আটকাতে আহ্বান জানান তিনি।

তৎকালীন সময়ে আইনি বিপদের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে তিনি সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন যে, এই ধরনের মামলাকে তিনি বিন্দুমাত্র ভয় পান না। সভার মঞ্চ থেকে তাচ্ছিল্যের সুরে তিনি জানান, তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে এবং আরও মামলা রুজু হলে তাঁর কিছু যায় আসে না। তবে নয়া আইনি নিয়মের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ার পর তাঁর এই সুর কতটা নমনীয় হয়, তা নিয়ে জলঘোলা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।

সোমবার বিধানসভার অধিবেশন চলাকালীন এই বিতর্কিত ও উগ্র মন্তব্যগুলির কড়া সমালোচনা করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি প্ররোচনামূলক বার্তার বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়ে সাফ বলেন যে, আইন সবার জন্য সমান। এই ধরনের সমাজবিরোধী মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি জোরের সাথে ঘোষণা করেন, অতীতে কে কীভাবে প্রশাসনকে ব্যবহার করেছে তা আর ধর্তব্যের মধ্যে পড়বে না। অন্যায়কে কোনওভাবেই সহ্য করা হবে না এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোরতম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন যে, আগের দুর্বল প্রশাসনের প্রশ্রয় পেয়ে অতীতে অনেকেই আইনের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন আপত্তিকর উক্তি করার সাহস পেতেন। কিন্তু পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ বদলেছে। তিনি পুলিশকে নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতার উপযুক্ত ধারায় অবিলম্বে মামলা শুরু করার নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গেই তিনি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মুর্শিদাবাদ পরিদর্শনে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলার বাস্তব চিত্র খতিয়ে দেখবেন বলেও ঘোষণা করেছেন।

মুখ্যমন্ত্রীর এই অত্যন্ত কড়া বিবৃতির এক ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় স্তরের পুলিশ প্রশাসন ব্যাপক তৎপরতা দেখাতে শুরু করে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত উস্কানিমূলক সভার তিন প্রধান আয়োজককে গ্রেফতার করে নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ। এর ঠিক পরদিনই বিপুল সংখ্যক পুলিশ আধিকারিকদের সাথে নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের একটি দল রেজিনগরে বিধায়কের বাসভবনে হানা দিল এবং হাজিরা সংক্রান্ত আইনি নোটিসটি ঝুলিয়ে দিয়ে এল।

বাড়িতে পুলিশি অভিযান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে বিধায়ক হুমায়ুন কবীর দাবি করেছেন যে, অভিযানের সময় তিনি বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না। তবে তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিবারের অন্য সদস্যরা নোটিসটি বুঝে পেয়েছেন কিনা তা ফিরে গিয়ে যাচাই করে দেখবেন। নোটিস পাওয়ার পর তিনি তাঁর আইনজীবীদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেবেন যে নির্দিষ্ট দিনে থানায় হাজিরা দেবেন কিনা।

Post Comment

You May Have Missed