অবিশ্বাস্য কামব্যাক! শেষ মুহূর্তের গোলে জাপানকে হারিয়ে শেষ ১৬-য় ব্রাজিল

অবিশ্বাস্য কামব্যাক! শেষ মুহূর্তের গোলে জাপানকে হারিয়ে শেষ ১৬-য় ব্রাজিল

Football

-Ritesh Ghosh

বিশ্বকাপের মঞ্চে আবার নিজেদের জাত চেনাল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। হাউস্টনের মাঠে জাপানের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে নাটকীয় জয় ছিনিয়ে নিল কার্লো আনসেলোত্তির দল। প্রথমার্ধে ছন্নছাড়া ফুটবল খেলার পর দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় সেলেসাওরা। অভিজ্ঞ কাসেমিরোর সমতাসূচক গোলের পর ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির জয়সূচক গোল ব্রাজিলকে নকআউট পর্বের টিকিট এনে দিল। নকআউট তথা শেষ ১৬-র ম্যাচে এবার নরওয়ে অথবা আইভরি কোস্টের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল।

এই ম্যাচটি ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জাপানের কাছে হেরে বিদায় নিলে ১৯৬৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব বা শুরুর দিকেই ছিটকে যেতে হতো সেলেসাওদের। নিজের দেশের বাইরের কোচ হিসেবে কার্লো আনসেলোত্তির নিয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা চরম রূপ নিতে পারত। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে আনসেলোত্তি প্রমাণ করলেন কেন তাঁর ওপর ভরসা করেছিল ব্রাজিলীয় বোর্ড। শেষ পর্যন্ত জয় পেলেও প্রথমার্ধে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স ছিল বেশ আশঙ্কাজনক।

Brazilian players celebrating historic World Cup comeback victory

ম্যাচের শুরু থেকেই অতি পরিকল্পিত ফুটবল খেলতে শুরু করে জাপান। বিশেষ করে প্রথমার্ধে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডদের পুরোপুরি বোতলবন্দি করে রেখেছিল ব্লু সামুরাইরা। জাপানের ৫-৪-১ ছক ভাঙতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে ভিনিসিয়াস জুনিয়রদের। জাপানি রক্ষণভাগের টেকহিরো তোমিয়াসু এবং রিতসু দোয়ান মিলে ভিনিসিয়াসকে কোনও ফাঁকা জায়গা দেননি। বাঁ-দিক দিয়ে বারবার আক্রমণ শানানোর চেষ্টা করলেও জাপানের নিশ্ছিদ্র ডিফেন্সের সামনে বারবার পরাস্ত হতে হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ তারকাকে, যা ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে ভেস্তে দিয়েছিল প্রথমার্ধ জুড়েই।

এরই মাঝে ব্রাজিলের মাঝমাঠের ক্লান্তি ও গতিহীনতাকে কাজে লাগিয়ে গোল তুলে নেয় জাপান। দানিলোর একটি ভুল পাস ধরে একক দক্ষতায় বল নিয়ে এগিয়ে যান কাইশু সানো। মাঝমাঠে ব্রাজিলের অভিজ্ঞ ৩৪ বছর বয়সী বিশ্বস্ত মিডফিল্ডার কাসেমিরো সানোর গতির কাছে পরাস্ত হন। সানো অনায়াসে রক্ষণভাগ ভেঙে জাপানের পক্ষে প্রথম গোলটি করেন। বুন্দেসলিগার গতিশীল ফুটবলার সানোর সামনে প্রথমার্ধে বেশ অসহায় লেগেছে ব্রাজিলের ব্যাকলাইনকে।

জাপানি গোলরক্ষক জায়ন সুজুকিও প্রথমার্ধে চিনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। জাপানের আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এই গোলরক্ষক ব্রাজিলিয়ানদের একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করেন। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে ভিনিসিয়াসের একটি দুর্দান্ত কোণাকুনি শট পোস্টের বাইরে ঠেলে দিয়ে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন সুজুকি। প্রথমার্ধ শেষে ব্রাজিল যখন ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল, তখন গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার ব্রাজিলীয় সমর্থকের মনে ১৯৬৬ সালের সেই কালো দিনগুলোর স্মৃতি উঁকি দিচ্ছিল।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই কোচ কার্লো আনসেলোত্তি একটি বড় জুয়া খেলেন। চোট পাওয়া লুকাস পাকেতার জায়গায় তিনি মাঠে নামিয়ে দেন তরুণ তারকা এন্ড্রিককে। মাঝমাঠ থেকে একজন খেলোয়াড় কমিয়ে আক্রমণভাগে চারজন ফরোয়ার্ড রেখে ৪-২-৪ ছকে খেলা শুরু করে ব্রাজিল। এই আক্রমণাত্মক রণকৌশল জাপানের জমাট রক্ষণকে এলোমেলো করে দেয়। দুই উইঙ্গার ভিনিসিয়াস এবং রায়ান বারবার প্রান্ত ধরে আক্রমণ চালিয়ে জাপানের ডিফেন্সকে চওড়া হতে বাধ্য করেন, যার ফলে বক্সের মধ্যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়।

এই ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তনের সুফল ব্রাজিল হাতেনাতে পায় ম্যাচের সমতাসূচক গোলের মাধ্যমে। গ্যাব্রিয়েল মাগালেসের একটি নিখুঁত ক্রস থেকে চমৎকার হেডে গোল করে ব্রাজিলকে সমতায় ফেরান কাসেমিরো। প্রথমার্ধে গতির কাছে হার মানলেও নিজের আসল শক্তি অর্থাৎ এরিয়াল ডমিনেন্স দিয়ে ভুল শুধরে নেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই বর্ষীয়ান মিডফিল্ডার। কাসেমিরোর এই গোলটি ব্রাজিল শিবিরে যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছিল, তা পরবর্তী আক্রমণগুলিতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

তবে নাটকের আসল অংশ তখনও বাকি ছিল। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে যখন সকলেই ধরে নিয়েছিল খেলাটি ড্র হতে চলেছে, তখনই জ্বলে ওঠেন গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি। আর্সেনালের হয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শেষ মুহূর্তের গোল করার রেকর্ড রয়েছে এই ২৫ বছর বয়সী ফরোয়ার্ডের। আনসেলোত্তি এদিন মার্টিনেল্লিকে তাঁর স্বাভাবিক পজিশন উইংয়ের বদলে একটু ভেতরের দিকে অর্থাৎ সেন্ট্রাল পজিশনে খেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে বক্সে আসা যেকোনও ক্রস তিনি সরাসরি কাজে লাগাতে পারেন।

ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে সেই পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হল। বক্সের ভেতর তৈরি হওয়া জটলার সুযোগ নিয়ে দুর্দান্তভাবে জাপানের গোলরক্ষক জায়ন সুজুকিকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান মার্টিনেল্লি। সুজুকি বলটিতে হাত ছোঁয়াতে পারলেও তার গতি রুখতে পারেননি। এই গোলের সঙ্গে সঙ্গেই হাউস্টনের স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়ে। পিছিয়ে পড়েও অসাধারণ লড়াকু মানসিকতা দেখিয়ে অবিশ্বাস্য এক জয় ছিনিয়ে নেয় সেলেসাওরা।

এই জয়ের ফলে ব্রাজিল ৫ জুলাই নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা শেষ ১৬-র ম্যাচে জায়গা করে নিল। শেষ ষোলোর মঞ্চে তাদের প্রতিপক্ষ নরওয়ে কিংবা আইভরি কোস্টের কেউ একজন হবে। সেই ম্যাচে কাসেমিরোর চোটের পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, সেটাই এখন দেখার। তবে জাপানের বিরুদ্ধে প্রথমার্ধের ধাক্কা কাটিয়ে ব্রাজিল যেভাবে ঘুরে দাঁড়াল, তা নিশ্চিতভাবেই তাদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নকে নতুন গতি দেবে।

Post Comment

You May Have Missed