ভারতের জ্বালানি ভবিষ্যতের রোডম্যাপ তৈরি আদানি গ্রুপের, রয়েছে মেগা পরিকল্পনা

ভারতের জ্বালানি ভবিষ্যতের রোডম্যাপ তৈরি আদানি গ্রুপের, রয়েছে মেগা পরিকল্পনা

India

-Ritesh Ghosh

ভারতের জ্বালানি ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব ও সুদূরপ্রসারী রোডম্যাপের উন্মোচন করলেন আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আদানি এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেডের বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) তিনি এই বহুমুখী মহাপরিকল্পনার ঘোষণা করেন। এই সমন্বিত কৌশলের আওতায় নবীকরণযোগ্য শক্তি, কয়লা, গ্যাস, জলবিদ্যুৎ, হাইড্রোজেন এবং পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকে একই কর্পোরেট কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে চলা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার আবহে ভারতের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা দেওয়াই এর লক্ষ্য।

শেয়ারহোল্ডারদের উদ্দেশে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে গৌতম আদানি জানান, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার এই সময়ে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। আদানির এই নতুন বহুমুখী কৌশলটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা কোনওরকম বিরতি ছাড়াই দেশজুড়ে সার্বক্ষণিক নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে। একইসঙ্গে পরিবেশবান্ধব বা সবুজ শক্তি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে দেশের কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যকেও ত্বরান্বিত করা হবে।

Gautam Adani announcing new 2026 energy strategy

এই বিশাল মহাপরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক পুঁজি বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শিল্পগোষ্ঠী। আদানি পাওয়ার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ৪৫ গিগাবাইট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার একটি মহৎ মূলধনী ব্যয় কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ভারতের বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের ইতিহাসে এই বিনিয়োগ প্রকল্পটিকে এ যাবৎকালের বৃহত্তম পদক্ষেপ বলা হচ্ছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও সাহায্য করবে।

দূষণমুক্ত সবুজ জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক চমৎকার ও সাহসী রূপরেখা তৈরি করেছে আদানি গোষ্ঠী। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভুটানের ড্রুক গ্রিন পাওয়ার কর্পোরেশনের সঙ্গে ইতিমধ্যেই একটি কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে, যার অধীনে ৫,০০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ভারতের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে অবিরত পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে বড় ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সবুজ শক্তির পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তির মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত ও অপ্রচলিত ক্ষেত্রেও বড় পুঁজি বিনিয়োগের সরাসরি ইঙ্গিত মিলেছে আদানির এই বার্ষিক সভা থেকে। আদানি অ্যাটমিক এনার্জির মাধ্যমে সংস্থাটি ২০৩৫ সালের মধ্যে ১০ গিগাবাইট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্রে বেসরকারি পুঁজির অংশীদারিত্ব ক্রমশ উন্মুক্ত হওয়ার এই সন্ধিক্ষণে আদানির এই অগ্রণী পদক্ষেপ অত্যন্ত দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রাহ্য হচ্ছে।

উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের প্রতিটি কোণে নির্বিঘ্নে পৌঁছে দেওয়ার আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতেও কাজ শুরু করেছে আদানি এনার্জি সলিউশনস। তাদের বর্তমান ট্রান্সমিশন অর্ডার বুকের সামগ্রিক আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭২,০০০ কোটি টাকায়। এর মধ্যে প্রধান আকর্ষণ হল খাভড়া থেকে দক্ষিণ ওলপাদ পর্যন্ত হাই ভোল্টেজ ডাইরেক্ট কারেন্ট (এইচভিডিসি) লাইন স্থাপন। দেশের প্রথম বেসরকারি সংস্থা হিসেবে আদানির কাছেই এখন এই দীর্ঘ দূরত্বের বিদ্যুৎ পরিবহণের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে।

চিরাচরিত জ্বালানি ক্ষেত্রেও নিজেদের একাধিপত্য আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে আদানি গোষ্ঠী। নতুন চারটি মাইন ডেভেলপার অ্যান্ড অপারেটর (এমডিও) চুক্তির মাধ্যমে তাদের বার্ষিক কয়লা উত্তোলনের ক্ষমতা এখন রেকর্ড ১৪৫ মিলিয়ন টনে পৌঁছে গিয়েছে। এর ফলে ভারতের বৃহত্তম বেসরকারি কয়লা খনি পরিচালনাকারী হিসেবে নিজেদের ভিত আরও মজবুত করল সংস্থাটি। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কয়লা উত্তোলন বৃদ্ধির কারণে দেশের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারবে।

অন্যদিকে সরাসরি জনমানসে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাচ্ছে আদানি টোটাল গ্যাস। ভারতের বিভিন্ন বড় ও মাঝারি শহরে ইতিমধ্যেই তাদের পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস বা পিএনজি সংযোগের সংখ্যা এক ধাক্কায় ১১ লক্ষের গণ্ডি অতিক্রম করে গিয়েছে। পরিবেশবান্ধব রান্নার গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এবং শেষ প্রান্তের উপভোক্তার কাছে নিরাপদ জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার পরিধি ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের সাধারণ নাগরিক মহল উপকৃত হচ্ছেন।

এই সুসংহত বহুমুখী বিদ্যুৎ পরিকল্পনার মাধ্যমে আদানি গোষ্ঠী মূলত জ্বালানি খাতের প্রথম ধাপ বা কয়লা উত্তোলন থেকে শুরু করে শেষ ধাপের বিপণন পর্যন্ত সমগ্র সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে চাইছে। বৈশ্বিক উথালপাথাল ও মূল্যবৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে সুরক্ষাকবচ দেওয়াই এই দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের সার্থকতা। একইসঙ্গে বৃহৎ পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের এই বিপুল অংশগ্রহণ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে সহায়ক হবে।

সবুজ শক্তির অভিমুখে রূপান্তর এবং সনাতনী বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বাস্তব চাহিদার মধ্যে এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করতে চায় আদানি। এই মহাপরিকল্পনা রূপায়িত হলে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন শিল্প লাভবান হবে বলে আশা করা যায়। এটি কেবল বাণিজ্য বিস্তারের একটি উপায় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ভারতকে একটি স্বনির্ভর ও জ্বালানি-সুরক্ষিত দেশ হিসেবে গড়ার বলিষ্ঠ প্রয়াস। বিশ্বমঞ্চে ভারতের অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও এই রূপান্তর ভবিষ্যতে অত্যন্ত ইতিবাচক ও অর্থবহ প্রভাব ফেলবে।

Previous post

Annapurna Yojana: ১ জুলাই ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ৩০০০ টাকা আপনি পাবেন? আদৌ আপনার ফর্ম জমা পড়েছে তো? এক ক্লিকে দেখে নিন

Next post

Sovandeb Chatterjee: ঋতব্রতদের নাম থাকলেও বিধানসভার বিএ কমিটিতে জায়গা পেলেন না কালীঘাট-ঘনিষ্ঠ তৃণমূল শিবিরের কেউ, বিবেচনার আশ্বাস অধ্যক্ষের

Post Comment

You May Have Missed