ভবানীপুরের ভোট নিয়ে মমতার করা মামলায় বড় নির্দেশ কলকাতা হাইকোর্টের!

ভবানীপুরের ভোট নিয়ে মমতার করা মামলায় বড় নির্দেশ কলকাতা হাইকোর্টের!

West Bengal

-Ritesh Ghosh

ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফল ঘিরে চলা আইনি লড়াইয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। ভোটগণনা কেন্দ্রের সমস্ত সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ অবিলম্বে সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওই কেন্দ্রের সমস্ত ইভিএম (EVM) এবং ভিভিপ্যাট (VVPAT) যাতে সুরক্ষিত থাকে, তাও নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আদালতের অনুমতি ছাড়া এই নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও তথ্য বা ভিডিও সরানো বা মুছে ফেলা যাবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্তের সিঙ্গল বেঞ্চে এই হাই-প্রোফাইল মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা সওয়াল-জবাব শেষে বিচারপতি এই কড়া নির্দেশ জারি করেন। আদালতের এই নির্দেশের ফলে ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোটগণনার সামগ্রিক নথিপত্র এবং ডিজিটাল প্রমাণগুলি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষই এই তথ্যগুলিতে পরিবর্তন করতে পারবে না। আগামী দুই মাস পরে এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।

Calcutta High Court orders preservation of Bhowanipore voting data

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর কেন্দ্রের এক নাটকীয় রাজনৈতিক লড়াইয়ের সাক্ষী ছিল পশ্চিমবঙ্গ। এই কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে বিপুল জয়লাভ করেন বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী। প্রায় ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ের পর শুভেন্দু অধিকারী নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তবে এই নির্বাচনী ফলাফলকে মেনে না নিয়ে গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টে ইলেকশন পিটিশন দাখিল করেছেন পরাজিত প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এদিনের শুনানিতে মমতার পক্ষে আদালতে অত্যন্ত জোরালো সওয়াল করেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি আদালতের সামনে ভবানীপুরের ভোটগণনা প্রক্রিয়ার বেশ কিছু নজিরবিহীন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, গণনার ১২তম রাউন্ড পর্যন্ত তৃণমূল প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় ৭,৮০০ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু এরপরই গণনা কেন্দ্রের ভিতরের পরিস্থিতি রহস্যজনকভাবে বদলে যায় এবং তৃণমূলের পোলিং এজেন্টদের জোর করে বের করে দেওয়া হয়।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতকে জানান যে, তৃণমূলের বিশ্বস্ত এজেন্টদের জোরপূর্বক বাইরে বের করে দেওয়ার পরপরই নাটকীয়ভাবে ভোটের ট্রেন্ড বদলে যেতে শুরু করে। পরবর্তী রাউন্ডগুলির গণনায় বিজেপি প্রার্থী তথা রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একতরফাভাবে ভোট পান, যা ট্রেন্ড প্রায় অসম্ভব বলে দাবি করা হয়েছে। এই পুরো গণনা প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত রহস্যজনক এবং এর পিছনে একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে তৃণমূলের আইনজীবী আদালতে দাবি করেছেন।

শুনানির সময় আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় গত ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম বিধানসভা নির্বাচনের অত্যন্ত বিতর্কিত ভোটগণনার প্রসঙ্গটিও আদালত কক্ষের শুনানিতে টেনে আনেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২১ সালে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের সময়ে যে রিটার্নিং অফিসার কর্মরত ছিলেন, তাঁকেই এবার হঠাৎ করে এবং অতি দ্রুততার সঙ্গে ভবানীপুরের এই স্পর্শকাতর নির্বাচনী কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছিল। এই আকস্মিক বদলির পিছনে একটি সুনির্দিষ্ট ছক কাজ করছিল বলে সরাসরি অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেসের আইনি সেল।

অভিযোগের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে আদালতে মমতার আইনজীবীর পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, বিতর্কিত ওই রিটার্নিং অফিসার বর্তমানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দপ্তরের যুগ্মসচিব পদে অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত রয়েছেন। ফলে এই বিশেষ নিয়োগ ও পোস্টিংয়ের পর থেকে তাঁর পক্ষপাতহীনতা ও প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়াটি প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যেই এই ধরনের সুক্ষ্ম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করছেন তারা।

এর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও নন্দীগ্রামের হাই-ভোল্টেজ লড়াইয়ে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময়েও নন্দীগ্রামের নির্বাচনী ফলাফলকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে ইলেকশন পিটিশন দাখিল করেছিলেন তিনি, যা এখনও আদালতের বিচারাধীন রয়েছে। এবার ভবানীপুরের ভোট নিয়েও একই ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।

Post Comment

You May Have Missed