আত্মনির্ভরতার নজির! ভারতীয় নৌবাহিনীতে যুক্ত হল তিনটি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, কলকাতায় উদ্বোধন মোদীর
West Bengal
-Ritesh Ghosh
ভারতীয় নৌবাহিনীর জলপথের যুদ্ধক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে আরও এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল দেশ। ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত অত্যাধুনিক তিনটি যুদ্ধজাহাজ—আইএনএস দুনগিরি (INS Dunagiri), আইএনএস সংশোধক (INS Sanshodhak) এবং আইএনএস অগ্রয় (INS Agray)-কে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি যেমন দেশের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগকে এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে দিল, তেমনই ভারতীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিশ্বমানের সক্ষমতাকেও বিশ্বের দরবারে তুলে ধরল। এই অনুষ্ঠানে মূল অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাজ্যপাল আরএন রবি, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সহ বিশিষ্টরা।
বর্তমান সময়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল রূপ নিয়েছে। এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার এবং নিরাপত্তার ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলির আধুনিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই পরিস্থিতিতে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তিনটি ভিন্ন গোত্রের রণতরী ভারতীয় নৌবাহিনীতে স্থান পাওয়া অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণ করার পাশাপাশি বিদেশী অস্ত্র বিক্রেতাদের প্রতি ভারতের নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে আনবে।

নৌবাহিনীতে যুক্ত হওয়া যুদ্ধজাহাজগুলির মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় নাম হল আইএনএস দুনগিরি। এটি মূলত ভারতীয় নৌসেনার প্রোজেক্ট ১৭এ (Project 17A) প্রকল্পের অধীনে তৈরি হওয়া চতুর্থ স্টিলথ ফ্রিগেট। গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (GRSE) দ্বারা নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন জাহাজটি আধুনিক শত্রু শনাক্তকরণ রাডার সেন্সর ও শক্তিশালী আক্রমণকারী ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত। আকাশপথের আক্রমণ রুখে দেওয়া এবং শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ বা সাবমেরিন ধ্বংস করার ক্ষেত্রে এই ফ্রিগেট অনন্য ভূমিকা পালন করবে।
এর আগের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এই যুদ্ধজাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে পূর্বে সুনামের সঙ্গে সেবা দেওয়া আইএনএস দুনগিরির নামেই। নতুন প্রজন্মের এই সংস্করণে উন্নত প্রযুক্তির স্টিলথ মেকানিজম বা রাডার ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি যুক্ত রয়েছে, যা আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে একে অনেক বেশি সুরক্ষিত ও অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। যেকোনো পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে নজরদারি এবং গভীরতর সামুদ্রিক লড়াইয়ে এটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হবে।
তালিকার দ্বিতীয় রণতরীটি হল আইএনএস সংশোধক, যা ভারত মহাসাগরের তলদেশের খোঁজখবর রাখতে বিশেষ সক্ষম। হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল (লার্জ) শ্রেণীর চতুর্থ এই জাহাজটি প্রস্তুত করেছে এল অ্যান্ড টি এবং জিআরএসই। নৌবাহিনীর নিজস্ব প্রকৌশলে তৈরি এই বিশেষ জাহাজটি মূল সমুদ্রের গভীরতা, পরিবেশ এবং সামুদ্রিক গঠনের বিশদ চিত্র ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করবে। এর সুবাদে তৈরি হওয়া সামুদ্রিক ডোমেন সচেতনতা কেবল যুদ্ধজাহাজের চলাচলকে মসৃণ করবে না, বরং দেশের বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও এক গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করবে।
নিখুঁত সমুদ্র গবেষণার মাধ্যমে পাওয়া গভীরতার তথ্য এবং সামুদ্রিক নকশা সামরিক রণকৌশল নির্ধারণে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এই দিক থেকে বিচার করলে, আইএনএস সংশোধক দেশের উপকূলীয় জলসীমা সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে এবং বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াতের সুবিধার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের তলদেশের সামগ্রিক বিন্যাস এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের উপর প্রতিনিয়ত নজর রাখতে এই অত্যাধুনিক জরিপ জাহাজটি দেশের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়াবে।
নৌবাহিনীর শক্তিবৃদ্ধির তালিকায় তৃতীয় যে জাহাজটি নতুন করে সাড়া ফেলেছে, তা হলো আইএনএস অগ্রয়। এটি মূলত একটি অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার শ্যালো ওয়াটার ক্রাফট (ASW SWC), যা অগভীর সমুদ্র এলাকায় সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ শনাক্ত ও প্রতিহত করার জন্য নকশা করা হয়েছে। উপকূলীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে ভারতীয় ডকইয়ার্ডগুলোর বহুমুখী সক্ষমতার আরেকটি অনন্য দৃষ্টান্ত এটি। এই আধুনিক রণতরীটি অগভীর কোস্টাল এরিয়ায় শত্রু নজরদারি এবং লজিস্টিক সহায়তার কাজে দারুণ কার্যকর হবে।
জলসীমা নজরদারি কার্যক্রমে স্বনির্ভরতা ফিরিয়ে আনতে এই শ্রেণির ছোট কিন্তু মারাত্মক আক্রমণাত্মক ক্ষমতার অধিকারী জাহাজগুলো এক বড় ভূমিকা পালন করে। আইএনএস অগ্রয়-এর মতো অত্যন্ত কাজের ও ভারসাম্যপূর্ণ জাহাজ যুক্ত থাকায় ভারতীয় নৌবাহিনীর কৌশলগত সক্ষমতা অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর চমৎকার আক্রমণাত্মক শক্তি এবং নিখুঁত সমন্বয়ের ব্যবস্থা শত্রু দেশের সাবমেরিনের পক্ষে ভারতীয় সমুদ্রসীমায় অনধিকার প্রবেশ অত্যন্ত কঠিন করে তুলবে।
এই তিনটি ভিন্নধর্মী নজরকাড়া যুদ্ধজাহাজের সফল নির্মাণ ও বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি ভারতের নিজস্ব নৌ-পরিকাঠামো ডিজাইনের অসামান্য উন্নতিরই ফসল। এটি আসলে ভারতীয় নৌসেনা, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি জাহাজ নির্মাণ সংস্থা, বিভিন্ন ছোট-বড় শিল্প উদ্যোগ এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের যৌথ অংশীদারিত্বের ফলেই সম্ভব হয়েছে। গত এক দশক ধরে ভারতীয় নৌবাহিনী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রতিরক্ষায় দেশীয় উপাদানের সংযুক্তি বাড়িয়ে চলেছে, যার স্বীকৃতি আজ গোটা বিশ্বের কাছে প্রমাণিত।
ভারতের মাটিতেই ভারী সামরিক জাহাজ তৈরি করার এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে এক নতুন শক্তি যোগাচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে লক্ষাধিক কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, দেশীয় ইঞ্জিনিয়ার ও গবেষকদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পগুলির (MSMEs) জন্য নতুন বাণিজ্যের দরজা খুলে যাচ্ছে। বিদেশ থেকে বিশাল ব্যয়ে সমরাস্ত্র আমদানির প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় ভারতের উপর অন্যান্য বৈশ্বিক পরাশক্তির অযাচিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে।
সবমিলিয়ে বলা যায়, আইএনএস দুনগিরি, আইএনএস সংশোধক এবং আইএনএস অগ্রয়-এর মতো যুদ্ধজাহাজগুলির বর্তমান সংযুক্তি দেশের জলসীমার কৌশলগত সক্ষমতাকে দৃঢ় করার অনন্য অধ্যায়। নিজের নকশায়, নিজের মাটিতে নির্মিত বিশ্বমানের প্ল্যাটফর্মগুলি ভবিষ্যতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দেশের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করবে। এই সামগ্রিক উদ্যোগটি ভারতকে ভবিষ্যতে সামুদ্রিক প্রতিরক্ষায় এক শক্তিশালী গ্লোবাল হাব তথা আক্ষরিক অর্থে এক স্বনির্ভর সামরিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করবে।



Post Comment