১৫ বছর বয়সেই বিশ্বরেকর্ড! শ্রীলঙ্কার মাটিতে ১১ বলে হাফ-সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে তোলপাড় বৈভবের
Cricket
-Ritesh Ghosh
বিশ্ব ক্রিকেটে এক নতুন ইতিহাস লিখল ভারতের ১৫ বছর বয়সী তরুণ তুর্কি বৈভব সূর্যবংশী। শ্রীলঙ্কার মাটিতে লঙ্কার বোলারদের নিয়ে এক প্রকার ছেলেখেলা করে মাত্র ১১ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করল এই বাঁহাতি ব্যাটার। এর মাধ্যমে লিস্ট এ ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্রুততম হাফ-সেঞ্চুরির বিশ্ব রেকর্ড নিজের নামে করে নিল বৈভব। রবিবার ডাম্বুলায় শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের বিরুদ্ধে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে এই অনন্য কীর্তি গড়েছে সে।
ডাম্বুলার রঙ্গিরি আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে ত্রিদেশীয় সিরিজের এই ফাইনালে টসে জিতে ভারতকে প্রথমে ব্যাট করতে পাঠিয়েছিল শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের অধিনায়ক সহন আরাচ্চিগে। কিন্তু তাদের সেই সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ করতে বিন্দুমাত্র সময় নেয়নি বৈভব। চলতি টুর্নামেন্টে এর আগে বিহারের এই বাঁহাতি ব্যাটারের পারফরম্যান্স মোটেও ভালো ছিল না। একের পর এক ম্যাচে ভালো শুরু করেও বড় রান না পেয়ে প্রবল চাপে ছিল সে। এমনকী আগের ম্যাচে মাঠে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সাথে এক অনভিপ্রেত বিতণ্ডাতেও জড়িয়ে পড়ে। তবে যাবতীয় কটাক্ষ আর অফ-ফর্মের সেরা জবাবটা ফাইনালে ব্যাট হাতেই দিল বৈভব।

প্রথম ওভারের প্রথম বল থেকেই লঙ্কার বোলারদের সাধারণ স্তরে নামিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করে বৈভব। শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞ বোলার মহম্মদ শিরাজকে ডিপ স্কোয়ার লেগের ওপর দিয়ে দর্শনীয় চার মেরে নিজের ইনিংসের সূচনা করে এই তরুণ ওপেনার। তবে আসল তাণ্ডব শুরু হয় শিরাজের দ্বিতীয় ওভারে। সেই ওভারে নিজের সম্পূর্ণ ক্লাস ফুটিয়ে তুলে তিনটি বিশাল ছক্কা এবং দুটি বাউন্ডারির সাহায্যে মোট ২৬ রান সংগ্রহ করে বৈভব। তাঁর এই অসাধারণ মারমুখী রূপ দেখে রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে যায় লঙ্কা শিবির।
ভেঙে গেল ২০ বছরের পুরনো রেকর্ড
মাত্র ১১ বলে হাফ-সেঞ্চুরি পূরণ করার সাথে সাথেই বৈভব ভেঙে দিল ২০ বছরের পুরনো এক রেকর্ড। ২০০৫-০৬ মরসুমে শ্রীলঙ্কার ঘরোয়া ক্রিকেটে রাগামা ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে কুরুনেগালা ইয়ুথ ক্রিকেট ক্লাবের বিরুদ্ধে মাত্র ১২ বলে অর্ধশতরান করেছিলেন কৌশল্য বীরত্নে। এতদিন পর্যন্ত লিস্ট এ ক্রিকেটে সেটিই ছিল দ্রুততম হাফ-সেঞ্চুরির রেকর্ড। দুই দশক ধরে অক্ষত থাকা সেই রেকর্ড এদিন অবলীলায় নিজের করে নিল বৈভব।
ভারতের ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, লিস্ট এ ম্যাচে এর আগে এমন বিধ্বংসী ব্যাটিং ভারতের কোনো ব্যাটার উপহার দিতে পারেননি। বৈভবের এই ইনিংসটি ভাঙল ভারতীয় ক্রিকেটের একটি বড় রেকর্ড, যা এতদিন মুম্বইয়ের তারকা ব্যাটার সরফরাজ খানের নামে ছিল। বিজয় হাজারে ট্রফিতে পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে ১৫ বলে অর্ধশতরান করেছিলেন সরফরাজ। ১৫ বছর বয়সী বৈভব যেভাবে হেলায় সেই রেকর্ড ভেঙে বিশ্বের তালিকায় শীর্ষে পৌঁছল, তা নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট মহলে জোর শোরগোল শুরু হয়েছে।
| বল | খেলোয়াড় | দল | প্রতিপক্ষ | মরসুম |
|---|---|---|---|---|
| ১১ | বৈভব সূর্যবংশী | ভারত ‘এ’ | শ্রীলঙ্কা ‘এ’ | ২০২৬ |
| ১২ | কৌশল্যা বীরাত্নে | রাগামা ক্রিকেট ক্লাব | কুরুনেগালা ইয়ুথ ক্রিকেট ক্লাব | ২০০৫-০৬ |
| ১৩ | তিসারা পেরেরা | শ্রীলঙ্কা আর্মি স্পোর্টস ক্লাব | ব্লুমফিল্ড ক্রিকেট ক্লাব | ২০২০-২১ |
| ১৪ | ররি ক্লেইনভেল্ট | ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স | কোয়াজুলু-নাটাল | ২০১০-১১ |
| ১৫ | অ্যাডাম হোলিওক | সারে | ইয়র্কশায়ার | ১৯৯৪ |
| ১৫ | সরফরাজ খান | মুম্বই | পাঞ্জাব | ২০২৫-২৬ |
শতকের দোরগোড়ায় এসে ট্র্যাজিক বিদায়
মাত্র ১১ বলে অর্ধশতরানের ইতিহাস গড়ার পরও বৈভবের আগ্রাসী মেজাজে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। শ্রীলঙ্কার স্পিনার থেকে শুরু করে পেসার—সবাইকে মাঠের বাইরে পাঠানোই যেন ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। লিস্ট এ ক্রিকেটে দ্রুততম শতরানের রেকর্ডটি স্পর্শ করার এক সুবর্ণ সুযোগ ছিল তাঁর সামনে। ওয়ানডে ক্রিকেটের গতিকে টি২০-র চেয়েও দ্রুত করে তুলেছিল সে। তবে শতকের খুব কাছে পৌঁছে প্রথম পাওয়ার-প্লে শেষ হওয়ার সামান্যতম আগে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাজঘরে ফিরতে হয় তাকে। লঙ্কা অধিনায়ক সহন আরাচ্চিগের একটু ধীরগতির বলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মিড-অফে সহজ ক্যাচ তুলে দেন তিনি।
আউট হওয়ার আগে বৈভবের ব্যাট থেকে আসে মাত্র ২৯ বলে ৯৪ রানের এক অবিশ্বাস্য ইনিংস। মাত্র ৬ রানের জন্য সে তার প্রাপ্য সেঞ্চুরিটি হাতছাড়া করে। যদি সে সেঞ্চুরি করতে পারত, তবে সেটিও বিশ্ব ক্রিকেটে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করত। কিন্তু সেঞ্চুরি না পেলেও পাওয়ার-প্লের মধ্যেই প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে যেভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দিয়ে গেল, তা দীর্ঘদিন ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে গেঁথে থাকবে।
১৫ বছর বয়সী এই বিস্ময় বালকের ক্রিকেট সফর কিন্তু বেশ অসাধারণ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে মাত্র ১৩ বছর বয়সে লিস্ট এ ক্রিকেটে তার অভিষেক হয়েছিল। বিহারের ক্রিকেটে বৈভব আগে থেকেই অত্যন্ত সুপরিচিত নাম। রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেক করার পাশাপাশি লিস্ট এ ক্রিকেটে বিহারের হয়ে ১৯০ রানের একটি দুর্দান্ত রাজকীয় ইনিংস রয়েছে তার দখলে। ভারতের তরুণ প্রতিভা খোঁজার তালিকায় বৈভব সূর্যবংশীর নাম এখন থেকে সবার ওপরেই থাকবে। মাত্র ১২টি ম্যাচ খেলেই তিনি প্রমাণ করে দিলেন কেন তাকে ভবিষ্যতের এক বড় সম্পদ ভাবা হচ্ছে।
বৈভব সূর্যবংশীর এই আগ্রাসী ব্যাটিং ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারতীয় ক্রিকেটে এক নতুন নক্ষত্রের উদয় হয়েছে। বড় মঞ্চে কীভাবে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলতে হয়, মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তা বুঝিয়ে দিল সে।



Post Comment