মুকেশ আম্বানির বড় ঘোষণা, এবার শেয়ার বাজারে আসতে চলেছে জিওর আইপিও

মুকেশ আম্বানির বড় ঘোষণা, এবার শেয়ার বাজারে আসতে চলেছে জিওর আইপিও

Business

-Ritesh Ghosh

ভারতীয় শেয়ার বাজারের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে চলেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের বৃহত্তম টেলিকম অপারেটর ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ‘জিও প্ল্যাটফর্মস’-এর আইপিও (IPO) আনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করলেন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানি। কোম্পানির ৪৯তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (AGM) তিনি জানান, জিও প্ল্যাটফর্মসের ড্রাফট রেড হেরিং প্রসপেক্টাস বা ডিআরএইচপি (DRHP) বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে এবং আজই তা বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবির (SEBI) কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে।

এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভারতীয় পুঁজিবাজারে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। মাত্র একদিন আগেই ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) তাদের বহুল প্রতীক্ষিত আইপিও-র খসড়া পত্র জমা দিয়েছে সেবির কাছে। ফলে খুব শীঘ্রই দেশের বাজারে একসঙ্গে দুটি মেগা আইপিও-র জোড়া আগমন ঘটতে চলেছে, যা ভারতের মূলধন ও ইকুইটি বাজারকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন দালাল স্ট্রিটের শীর্ষস্থানীয় বাজার বিশেষজ্ঞরা।

Mukesh Ambani announces Reliance Jio IPO filing

এর আগে গত বছরের বার্ষিক সাধারণ সভায় মুকেশ আম্বানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের বা জুন মাসের মধ্যেই জিও-র লিস্টিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক কয়েক দিন আগেই বৃহস্পতিবারের এই বড় ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রবল উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। নতুন করে এই খসড়া প্রস্তাব অনুমোদনের খবরটি স্পষ্ট করে দিল যে, রিলায়েন্স তাদের পূর্বের সময়সীমা বজায় রাখতেই তৎপর।

এই মেগা আইপিও প্রক্রিয়া পরিচালনার নেপথ্যে রয়েছে রিলায়েন্সের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্রিয় ভূমিকা। মুকেশ আম্বানি শেয়ারহোল্ডারদের উদ্দেশ্যে জানান যে, তাঁর তিন সন্তান — ইশা আম্বানি, আকাশ আম্বানি এবং অনন্ত আম্বানি যৌথভাবে এই আইপিও প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রিলায়েন্সের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের এই প্রথম সারিতে অবস্থান আগামী দিনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও ভরসা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

উভয় লিঙ্গ ও ক্ষমতার সমতার সঙ্গে দায়িত্ব হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি মূলত রিলায়েন্সের দীর্ঘমেয়াদী বৃদ্ধির কৌশলের একটি অন্যতম অংশ। জিওর মতো দেশজুড়ে বিস্তৃত একটি প্রযুক্তি ও ডিজিটাল পরিষেবা সাম্রাজ্যকে শেয়ার বাজারে প্রথমবার তালিকাভুক্ত করার মতো জটিল ও সংবেদনশীল কাজের সম্পূর্ণ নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মের কাঁধে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, আম্বানি পরিবার তাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক রূপরেখা ও কর্পোরেট চালিকাশক্তি নিয়ে কতটা সুনিশ্চিত।

বহু বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে তোলা এই সংস্থাকে আইপিও-র আঙিনায় নিয়ে আসার মুহূর্তটিকে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানি। তিনি বলেন, “এটি আমার জন্য, সমগ্র রিলায়েন্স পরিবারের জন্য এবং আমাদের কোটিরও বেশি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য অত্যন্ত একটি আবেগঘন মুহূর্ত। রিলায়েন্স তার লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর সাথে যে আত্মিক সম্পর্ক ভাগ করে নেয়, তা পারস্পরিক প্রবৃদ্ধি ও গভীর শ্রদ্ধাবোধের ওপর নির্মিত।”

এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন রিলায়েন্সের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা ধীরুভাই আম্বানির ব্যবসায়িক দর্শনের কথা। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করা এবং সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে আদর্শ ধীরুভাই দেখিয়েছিলেন, রিলায়েন্স গ্রুপ আজীবন সেই পবিত্র নীতি অনুসরণ করবে বলে তিনি পুনরায় প্রতিশ্রুতি দেন।

২০১৬ সালে প্রথম পা রাখার পর থেকে ভারতের টেলিকম খাতের সামগ্রিক মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে রিলায়েন্স জিও। অতি সুলভ মূল্যে ফোরজি ট্রাফিক এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট পরিষেবা মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দিয়ে জিও আজ দেশের বৃহত্তম টেলিকম অপারেটরে পরিণত হয়েছে। এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যমেই তারা সীমাবদ্ধ নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল সলিউশনের জায়ান্ট হয়ে উঠেছে।

মুকেশ আম্বানি জোর দিয়ে বলেন, জিওর লিস্টিং বিশ্বমঞ্চে ভারতের নিজস্ব কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সার্থক প্রমাণ দেবে। আইপিও-র মাধ্যমে বিশ্ববাসী জানতে পারবে যে, ভারতও আন্তর্জাতিক মানের এবং অত্যন্ত শক্তিশালী টেক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পুরোপুরি সক্ষম। রিলায়েন্স প্রধান দাবি করেন যে, নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য আগামী দিনে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় লাভের ক্ষেত্র অপেক্ষা করে আছে।

লগ্নিকারীদের জন্য আগামী কয়েকটি মাস ভারতের শেয়ার বাজারে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হতে চলেছে। একদিকে ভারতের সর্ববৃহৎ স্টক এক্সচেঞ্জ এনএসই এবং অন্যদিকে সর্ববৃহৎ টেলিকম কোম্পানি জিও—উভয় জায়ান্ট সংস্থাই প্রায় একই সময়ে বাজারে পাবলিক ইস্যু আনতে চলেছে। দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক লগ্নির পরিকল্পনা করছেন এমন প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরো বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি এক সুবর্ণ সময় বলে মনে হতে পারে。

যদিও আইপিও-র সুনির্দিষ্ট মোট আয়তন, মূল্যায়ন বা ভ্যালুয়েশন এবং শেয়ার বাজারে আসার অফিশিয়াল তারিখ কেবল সেবির খসড়া পত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পরেই স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হবে। আগামী কয়েক সপ্তাহে বাজার নিয়ন্ত্রকের অনুমোদন প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর বাজারের নজর থাকবে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থবাজারের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন থাকে, তাও বিনিয়োগকারীদের লাভ-ক্ষতির অঙ্ক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

অবশেষে রিলায়েন্স জিও-র আইপিও নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলা অপেক্ষার সফল অবসান ঘটতে চলেছে। খসড়া প্রস্তাব সেবির কাছে পাঠানোর খবরে দেশের মূলধন সংগ্রাহক বাজারে ইতিমধ্যে এক দারুণ গতিশীলতা তৈরি হয়েছে। দেশের বাজারে এই জোড়া আইপিও-র দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হবে এবং আম্বানি পরিবারের তরুণ নেতৃত্ব কীভাবে এই যুগান্তকারী পরিবর্তনকে পরিচালনা করতে পারে, এখন তা দেখার অপেক্ষাতেই প্রহর গুণছে দেশের বিনিয়োগকারীরা।

Previous post

Sikkim Route Closed Update: পাহাড় ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান? টানা বৃষ্টিতে ধস, রাস্তা বন্ধে বিপর্যস্ত সিকিম, দার্জিলিং-কালিম্পঙেও বিশেষ সতর্কতা

Next post

Reliance AGM 2026: লক্ষ্য ২০৩০, জিও-র মাস্টারপ্ল্যান প্রকাশ আকাশ আম্বানির

Post Comment

You May Have Missed