নিট-ইউজি প্রশ্ন ফাঁস রুখতে টেলিগ্রাম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তেই সিলমোহর দিল্লি হাইকোর্টের

নিট-ইউজি প্রশ্ন ফাঁস রুখতে টেলিগ্রাম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তেই সিলমোহর দিল্লি হাইকোর্টের

India

-Ritesh Ghosh

NEET-UG ২০২৬-এর পুনর্পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া একটি অত্যন্ত বড় ও নজিরবিহীন পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ বৈধ বলে ঘোষণা করল দিল্লি হাইকোর্ট। পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও জালিয়াতি রুখতে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামের ওপর সাময়িক যে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, তা বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বিচারপতি তেজস কারিয়ার সিঙ্গল বেঞ্চ টেলিগ্রাম কর্তৃপক্ষের দায়ের করা আবেদন খারিজ করে দিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানায়, দেশের বৃহত্তম সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার স্বচ্ছতা রক্ষায় সরকারের নেওয়া এই বিশেষ পদক্ষেপ পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত ও আইনসম্মত।

গত ৩ মে তারিখে অনুষ্ঠিত মূল নিট-ইউজি পরীক্ষাটি দেশজুড়ে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ আসার পর বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয় প্রশাসন। এই ঘটনার জট দূর করতে এবং চক্রান্তকারীদের চিহ্নিত করতে তদন্ত চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা বা সিবিআই। এরপর পুনরায় নতুন করে পরীক্ষার দিন নির্ধারণ করা হলে, জালিয়াতি চক্রের যাবতীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে এবং সামাজিক মাধ্যমে পরীক্ষার মর্যাদা রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় ইলেক্ট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক (MEITY) সমগ্র দেশে টেলিগ্রাম পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ জারি করে।

Delhi High Court upholds Telegram ban for NEET-UG 2026

জাতীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা বা এনটিএ-র সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা ও বিশেষ সুপারিশের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রক ২২ জুন পর্যন্ত টেলিগ্রামের ব্যবহার ভারতীয় ব্যবহারকারীদের জন্য বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। এর পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মটির কিছু বিশেষ ফিচারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পরীক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর অর্থাৎ ৩০ জুন পর্যন্ত টেলিগ্রামের সকল পুরনো টেক্সট মেসেজ পরিবর্তন করার সুবিধা সম্পূর্ণরূপে ব্লক করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো পুরোনো প্রমাণ নষ্ট বা জালিয়াতি না করা যায়।

আদালতের শুনানির সময় কেন্দ্রীয় সরকারের সপক্ষে অংশ নিয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা একাধিক যুক্তি পেশ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, টেলিগ্রামের মতো ক্রিপ্টোগ্রাফিক গোপনীয়তা এবং বিশেষ অ্যান্ড-টু-অ্যান্ড সিকিউরিটি ফিচারের অপব্যবহার করে অনেক সময়ই অপরাধীচক্র অতি সহজেই বেনামে অনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে। এই পরিস্থিতিতে প্ল্যাটফর্মটিতে নজরদারির সুযোগ সীমিত থাকায় অপরাধীদের সরাসরি চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। তাছাড়া একাউন্ট ডিলিট করলে এর সংগৃহীত সমস্ত ডেটা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মূলত পূর্বে হওয়া জাতীয় স্তরের নিট পরীক্ষার ভয়াবহ প্রশ্ন ফাঁসের চক্রটি যেভাবে সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমটিকে ব্যবহার করেছিল, তা ভবিষ্যতের পুনরাবৃত্তি থেকে রক্ষা করতেই তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০-এর ধারা ৬৯-এ প্রয়োগের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়। দিল্লি হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পরীক্ষা পর্ব শেষ হওয়া পর্যন্ত অন্তত এই কদিনের জন্য এটিই সবচেয়ে কম কড়া অথচ কার্যকর ব্যবস্থা ছিল। অন্য কোনো পন্থায় অপরাধীদের নেটওয়ার্ক সহজে ভেঙে নেওয়া সম্ভব ছিল না।

দেশের কয়েক লক্ষ যোগ্য ছাত্রছাত্রীর ক্যারিয়ার ও কঠোর পরিশ্রম এবং সমগ্র চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রবেশিকা প্রক্রিয়ার বিশুদ্ধতা জড়িয়ে রয়েছে নিটের মতো একটি দেশব্যাপী পরীক্ষার সঙ্গে। সেই দিকে নজর রেখে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দল এবং আইনি সংস্থার রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে আদালতে বারবার বলা হয়েছে যে, কোনো প্রকার বাকস্বাধীনতা খর্ব করা তাদের উদ্দেশ্য নয় এবং পরীক্ষা সম্পন্ন হয়ে গেলেই টেলিগ্রাম অ্যাপটি পুনরায় ভারতে স্বাভাবিক পরিষেবা প্রদান করবে।

সরকারের জারি করা ব্লক করার এই নোটিশের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতের শীর্ষ আদালতে যাওয়ার আগে দিল্লি হাইকোর্টে দ্বারস্থ হয়েছিল টেলিগ্রাম কোম্পানি। আদালতে তাদের তরফে দাবি করা হয়েছিল যে, কেন্দ্রীয় সরকারের এই একতরফা স্থগিতাদেশ ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখিত সমান অধিকারের মৌলিক দাবিটিকে ক্ষুণ্ণ করে। কোম্পানির নিয়োজিত প্রবীণ আইনজীবী ধ্রুব মেহতা আদালতে জোর দিয়ে বলেন, অন্যান্য মেসেজিং এবং যোগাযোগের প্ল্যাটফর্মগুলিকে নির্বিঘ্নে কাজ করার অধিকার দিয়ে শুধুমাত্র টেলিগ্রামকে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত বৈষম্যমূলক আচরণ।

আইনজীবী ধ্রুব মেহতা শুনানিতে সরকারের আদেশনামার কড়া সমালোচনা করে বলেন, একটি একাডেমিক প্রবেশিকা পরীক্ষা কীভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার ক্ষেত্রে বিশাল সংকট ডেকে আনতে পারে, তা নিয়ে সরকারের দেওয়া নির্দেশে কোথাও কোনো স্পষ্ট বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। টেলিগ্রাম কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা সবসময়ই ভারতীয় আইন ব্যবস্থার প্রতিটি নিয়ম শ্রদ্ধার সাথে মেনে এসেছে এবং সরকারের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিয়মাবলীও আপডেট করতে দ্বিধা করেনি।

আইনি বিতর্কের সময় নিজেদের সক্রিয়তার বেশ কয়েকটি প্রমাণও হাজির করে এই জনপ্রিয় মেসেজিং কোম্পানিটি। গত মে মাস থেকেই ভারতের তদন্তকারী গোয়েন্দা সংস্থাগুলির সঙ্গে তারা নিরন্তর ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল বলে সাফ জানায়। গত ৯ জুন এনটিএ বা আইটি মন্ত্রকের তরফে প্রেরিত নির্দিষ্ট সমস্ত লিঙ্কের তালিকা হাতে পাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই তারা নিজস্ব মডারেটর কর্মীদের দিয়ে কাজ করিয়ে ভারতের ইন্টারনেট থেকে নিট জালিয়াতি সংশ্লিষ্ট প্রায় ৯০০টির বেশি বেআইনি লিঙ্ক পাকাপাকিভাবে মুছে ফেলেছিল।

নিজেদের ডিজিটাল পরিকাঠামোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে টেলিগ্রাম আদালতকে আশ্বস্ত করে জানায় যে, তারা তাদের সিস্টেমে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পূর্ণ অ্যালগরিদম ও ডেটা মডেলের প্রয়োগ করেছে। এই প্রযুক্তির মেলবন্ধনে যেকোনো বেআইনি কার্যকলাপ সম্পন্ন হওয়ার আগেই তা আটকে দেওয়ার জন্য দিনরাত তদারকি চলছে। তবে এতদসত্ত্বেও বিচারপতি তেজস কারিয়ার একক বেঞ্চ সরকারের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত মান্যতা দান করেছে এবং পরীক্ষা সুরক্ষার স্বার্থকে কোনো কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থের ওপরে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে。

আদালতের স্পষ্ট অভিমত ছিল যে, দেশের মেধা তালিকায় স্থান পাওয়ার জন্য লড়াই করা লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর জীবন ও futures নিরাপত্তা কোনো আপসের বিষয় হতে পারে না। এই কটি দিনের জন্য সরকারি সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে পরীক্ষায় কড়া নজরদারি চালানোর পক্ষে সায় দেওয়াই জনস্বার্থের সবচেয়ে বড় দাবি। সুতরাং, দেশের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা অটুট রাখার স্বার্থেই এই প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধের ওপর আর কোনো প্রকার বাধা বা রুলিং জারি করতে চায়নি দিল্লি হাইকোর্ট।

ডিজিটাল ভারতের ইতিহাসে এই ঘটনার অপরিসীম গুরুত্ব থাকবে। তথ্যপ্রযুক্তির অধিকার এবং জাতীয় জনস্বার্থে কঠিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার চূড়ান্ত বিরোধে এই যুগান্তকারী রায় এক নতুন নজির তৈরি করল। সাময়িক সময়ের জন্য টেলিগ্রাম পরিষেবা বন্ধ হওয়া ডিজিটাল স্বাধীনতার প্রশ্ন তুললেও, ভারত জুড়ে আগামী দিনে সরকারি পরীক্ষা পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা ও অনলাইন অপরাধ দমন করার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাকে এ রায়ের মাধ্যমে চরম আইনি সমর্থন দেওয়া হল।

Post Comment

You May Have Missed