‘পুরনো চাল ভাতে’ বাড়বে পশ্চিম মেদিনীপুরে ? একসময়ের বামেদের দুর্ভেদ্য দুর্গে পাল্লা ভারী কার ?
দীপক ঘোষ, পশ্চিম মেদিনীপুর: ব্রিটিশ ভারতে সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের মুখ্য কেন্দ্র এই ভূমি এখন উত্তাল আসন্ন বিধানসভা ভোটকে ঘিরে।অতীতে এটাই বলা হতো বাংলা ভারতকে পথ দেখায়। হয়তো আজ আর বলা হয় না। যে সময় বাংলা ভারতকে পথ দেখাত সেই সময়ে বাংলাকে পথ দেখিয়েছিল মেদিনীপুর। এই মাটির সন্তান ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ক্ষুদিরাম বসু, মাতঙ্গীনি হাজরা এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো কালজয়ী ব্যক্তিত্ব যারা বাংলার গর্ব, গোটা দেশের গর্ব। সেই মাটি এখন উত্তপ্ত বাংলার মসনদ দখলের লড়াইয়ে। বাম আমলে এই মাটি ছিল বামেদের দুর্ভেদ্য দুর্গ। এখন সেটা পাল্টা হয়েছে তৃণমূলের। বামেরা এখন এখানে চোয়াল কষা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের দুর্গ পুণরুদ্ধারের স্বপ্ন নিয়ে।
আরও পড়ুন, ‘যুবসাথী’-র ‘দরখাস্ত’ নিয়ে এবার জরুরি বার্তা মমতার,” আরও….পাবেন”
সিপিএম নেতা ও প্রার্থী মধুসূধুন রায় : জেতার ব্যাপারে আমরা ১০০ শতাংশ আশাবাদী। এই কয়েকদিন খড়গপুর চষে বেরিয়েছি।..সব মানুষের একটাই চাহিদা যে লাল আবার ফিরে আসুক। বাম আবার ফিরে আসুক।
প্রশ্ন : গোটা জেলাতে লড়াইটা কোন জায়গায় দাঁঁড়িয়ে ?
সিপিএম নেতা ও প্রার্থী মধুসূধুন রায় : গোটা জেলার লড়াই এবার বামপন্থীদের সঙ্গে হবে। ২০১৬ সালের তথ্য যদি দেখি, বাম-কংগ্রেস জোট পেয়েছিল ৩৯ শতাংশ। তৃণমূল পেয়েছিল ৪৫ শতাংশ। বিজেপি পেয়েছিল ১১ শতাংশ। বিজেপি ভোট না কাটলে ২০১৬ সালেই এই সরকারটাকে সরিয়ে দিত মানুষ। এইবারের নির্বাচন গোটা জেলাতেই , আমারা বামপন্থীরা যথেষ্ট ভাল জায়গায় আমরা আছি। যত জায়গায় পথসভা হচ্ছে, সবজায়গায় আগেই বামপন্থীদের আক্রমণ করে কথা বলা হচ্ছে। যা আগে তাঁরা বলতেন না। অর্থাৎ তারাও বুঝতে পারছেন, লড়াইটা ত্রিমুখী হবে। দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্তিতার কোনও জায়গা নেই।
একসময় কংগ্রেসকে কোণঠাসা করেই এই জেলার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল বামেরা। বাম আমলে দীর্ঘ সময় সিপিআই বনাম কংগ্রেসের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সাক্ষী থেকে মেদিনীপুর। কিন্তু ২০১৬ সালেই দেখা গিয়েছিল উলটপূরাণ। কংগ্রেসের সঙ্গে বামেরা ময়দানে নেমেছিল তৃণমূলের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে, এখানে ১৫ আসনের মধ্যে ৪ টি আসন নিতে পেরেছিল জোট প্রার্থীরা। বাকি ১১ টা জিতে নিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস।
| ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোট | |
| পশ্চিম মেদিনীপুর | |
| মোট আসন | ১৫ টি |
|
তৃণমূল |
১১ টি |
| সিপিএম + কংগ্রেস | ৩+ ১ = ৪ টি |
তবে একুশের নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এই জেলায়। তবুও বামেদের মতো কংগ্রেসও সর্বস্ব নিয়ে ঝাঁপিয়েছে মেদিনীপুরে। এবারের ভোটে কোনও জোট হয়নি। ছাব্বিশের ভোটে একাই লড়ছে কংগ্রেস।
প্রশ্ন: জেলায় তো মোট ১৫ টা আসন, ২০১৬ সালে আপনারা ১ জিতিছিলেন, সিপিএমের সঙ্গে সহযোগিতা ছিল। তারপর থেকে আপনারা নেই এখানে। নেই থেকে কী করে ?
কংগ্রেসের জেলা সভাপতি দেবাশিষ ঘোষ : দেখুন , আমাদের চাচা হেরে যাওয়ার পর একটাই নির্বাচন হয়েছে ২০২১ সালে। একুশে যে নির্বাচন হয়েছিল, হিন্দু মুসলমানের ব্যাপার ছিল। কিন্তু এখন যেটা হচ্ছে, মানুষ তৃণমূল বিজেপি দুইয়ের উপরেই একদম ক্ষুব্ধ আছে। তাঁরা আর তৃণমূল, বিজেপিকে চাইছে না।
প্রশ্ন: শেষবারের ভোটের হারের সঙ্গে এবার কতটা বাড়তে বা কমতে পারে ?
কংগ্রেসের জেলা সভাপতি দেবাশিস ঘোষ : আমরা তো টার্গেটে আছি, ১৫ থেকে ২০ শতাংশ যাবো। খড়গপুরে যে ক্যান্ডিডেট আছে, জেলার ভিতরে বোধহয় অন্যান্য ক্যান্ডিডেটের থেকেও ভাল।
বাম-কংগ্রেস কার্যত নিশ্চিহ্ন হলেও, এখানে উথ্থান হয়েছে বিজেপির। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে চমকে দেওয়ার মতো ভোট পেয়েছিল বিজেপি। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে গেরুয়া শিবির তৃতীয় স্থান দখল করলেও এখানে ৮ শতাংশের বেশি ভোট পায় তারা। অন্যদিকে বাম-কংগ্রেস জোট ও তৃণমূলের মধ্যে ভোটের পার্থক্য ছিল সাড় ছয় শতাংশ। সেবার এই জেলায় তৃণমূলের দুর্গ রক্ষায় অনেকটাই সহায়ক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল বিজেপি। তৃণমূলের সেই দুর্গ ছিনিয়ে নিতেই মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে বিজেপি। দশবারের বিধায়ক কংগ্রেসের জ্ঞান সিং সোহনপালকে হারিয়ে বাংলার রাজনীতিতে মতো উত্থান হয় দিলীপ ঘোষের। এরপর ২০১৯ সালে তিনি সাংসদ হন এই জেলা থেকেই। ২০২৪ সালে পশ্চিম বর্ধমান থেকে লোকসভা ভোটে হারার পর, একের পর এক ঘটনায় তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার যখন ডামাডোলের মধ্যে, তখনই আবার ফিরে এসেছেন তার পুরনো কেন্দ্রে, নতুন করে নিজেকে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে।
প্রশ্ন : রেসপন্স কেমন পাচ্ছেন আপনি ?
বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ : দেখতে পাচ্ছেন আপনার সামনে মেলা লেগে গেছে। ছোট বড় সবাই রাস্তায় বেরিয়ে আমায় সম্ভর্ধনা দিচ্ছে। মালা পরাচ্ছে। ছাদ থেকে পুষ্প বৃষ্টি হচ্ছে। সে প্রধানমন্ত্রী হলে এরকম হয়। এখানে তো আমি একটা বস্তিতে ঢুকেছি। আমার দিদি, বেলাদি প্রাক্তন কাউন্সিলার এখানকার, বাড়ি বাড়ি সম্পর্ক। আমিও বহুবার এসেছি, লোকের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করি। তো সাধারণ মানুষ বিজেপিকে এখানে আপন করে নিয়েছে। সাধারণ মানুষ বিজেপির সঙ্গেই আছে।
প্রশ্ন : মেদিনীপুরে কতটা আসন পেতে পারেন, এবং ফলাফল কী হতে পারে পশ্চিম মেদিনীপুরে ?
বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ : এই খড়গপুরই দিলীপ ঘোষকে নেতা বানিয়েছিল। রাজ্য সভাপতি হয়েছিলাম। প্রথম এমএলএ এখান থেকে। …মেদিনীপুরে অল্প অল্প ভোটে গতবার হেরেছিলাম। এবারে ম্যাক্সিমাম সিট, মেদিনীপুরে বিজেপি জিতবে। পূর্ব, পশ্চিম সব।
প্রশ্ন: পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হতে চলেছে আগামী ১ মাস পর ?
বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ :পরিবর্তন হবে, সরকার হবে, এটা নিশ্চিত। খালি সময়ের অপেক্ষা। বিজেপিতে ১০ জন লোককে আপনি, ..আর যার নাম কেউ জানে না, সেও যদি মুখ্যমন্ত্রী হয়, বিজেপি নিজের মত সুশাসন দেবে। সারা দেশে দিচ্ছে।
২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে দিলীপ ঘোষ বিধায়ক থেকে সাংসদ হয়েছিলেন যাকে হারিয়ে, সেই মানস ভুঁইয়াও এবার রয়েছেন বিধানসভার ভোটযুদ্ধে। তিনিও লড়ছেন তার পুরনো দুর্গ সবং থেকেই। পোড় খাওয়া এই রাজনীতিবিদ মনে করেন, এই জেলায় এবার তার দল তৃণমূলের সঙ্গে যৎসামান্য লড়াই করতে পারবে বিজেপি, কিন্তু বামেদের কোনও সম্ভাবনা নেই লড়াইয়ে ফেরার। নিজের পুরনো দল কংগ্রেসকে তো ধর্তব্যের মধ্যেই আনতে চান না তিনি।
সবং তৃণমূল প্রার্থী মানস ভুঁইয়া : তৃণমূলটাই তো কংগ্রেস হয়ে গিয়েছে। কংগ্রেস কিছু নেই। অধীরবাবুরা, মান্নান সাহেবরা কংগ্রেসটাকে সিপিএম এর চাকরে পরিণত করে দিল। জিতব আমরা। আমরা জিতব। আজকে লিখে রাখুন। অন রের্কড। উই উইল ক্রস ২০০।..সিপিএম অত্যাচার করে ভয় দেখিয়ে অত্যাচার করে ঢোকার চেষ্টা করত। আর এ দলমত নির্বিশেষে, বিনাপয়সায় রেশন, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যস্বাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার..কেউ একটা সিপিএম, কেউ একটা বিজেপি বলতে পারবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল ছাড়া কাউকে দেয়নি। কোনও ব্যাক্তির কিছু কাজ দলের উপর আসবে কেন ? এর জন্য আইন আছে, আদালত আছে, বিচার হচ্ছে, বিচারে যা হবে, তাই হবে। বাংলাকে অপমান করছে বিজেপি। বাঙালিকে অপমান করছে বিজেপি। একুশ থেকে সিপিএম এর গোডাউন ফাঁকা।
প্রশ্ন : লড়াই আপনাদের গেরুয়া বাহিনীর সঙ্গে ?
সবং তৃণমূল প্রার্থী মানস ভুঁইয়া : গেরুয়া নয়, লাল-গেরুয়ার মিশ্রণ।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই জেলায় মাত্র ২টি আসন পেয়েছিল বিজেপি। উল্টোদিকে ১৩টি আসনে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের বিভানসভা ভিত্তিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এখানে মাত্র একটি আসনে এগিয়ে বিজেপি। বাকি ১৪টিতে এগিয়ে তৃণমূল।
বিধানসভা ভোটের যুদ্ধে তৃণমূলের অন্যতম ভরসার জেলা পশ্চিম মেদিনীপুর। নিজেদের দুর্গ অটুট রাখতে এখানে চেষ্টার কোনও ত্রুটি নেই শাসকদলের। রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি ভোটারদের কাছে টেনে রাখতে গ্ল্যামার জগৎকেও মাঠে নামিয়েছে তারা। যেটা তৃণমূলের পরীক্ষিত কৌশল।
প্রশ্ন: আপনি সাংসদ হওয়ার পরে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে…কেমন লাগছে অনুভূতিটা কেমন ?
কোয়েল মল্লিক : ভীষণ ভাল লাগছে।.. আমর অনুভূতিটা কথায় প্রকাশ করতে পারব না। ..তাঁদের চাহনি দেখেই মনে হয়েছে, তাঁরা আমাকে কতবছর ধরে ভালবেসেছেন , কত চেনেন তাঁরা আমাকে ! কতটাই আমাকে আপন করে নিয়েছে।
প্রশ্ন : আপনি যখন যেখানে যাচ্ছেন, মানুষ উচ্ছ্বসিত হয়েছে, আপনি কী করে বুঝতে পারেন, তৃণমূলের জন্য উচ্ছ্বসিত নাকি কোয়েল মল্লিকের জন্য উচ্ছ্বসিত ?
কোয়েল মল্লিক : দেখুন একটু আগেই মানস বাবুকে বলছিলাম, আমার এখানে আসাটা, ভোট চাওয়ার জন্য নয়। কারণ আমি জানি যে আমাদের জিত, সুনিশ্চিত আছে। আমরা জিতবই। সেটাতে কোনও দ্বন্দ্ব নেই। তৃণমূল-কোয়েল সব মিলিয়ে আমার মনে হয়, সবটাই এক।
দেব-কোয়েলের মতো তৃণমূলের ঘরের লোক যেমন গ্ল্যামারের পসরা নিয়ে মাঠে সক্রিয়, তেমন সক্রিয় তৃণমূলের প্রথম সারির রাজনৈতিক মুখগুলিও।২০২৬-এর নির্বাচন বাম- কংগ্রেসের ঘর শক্তিশালী করার লড়াই হলেও এটা তৃণমূল এবং বিজেপির জন্য মসনদের লড়াই। এই জেলার দখল নেওয়া মানে সংখ্যার দৌড়ে সমৃদ্ধ হওয়া। তাই দই তরফেই মেদিনীপুর এখন মল্লযুদ্ধের আখড়া।



Post Comment