বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবিতে উদ্ধার ৯ মৎস্যজীবীর দেহ, শোকপ্রকাশ প্রধানমন্ত্রী মোদীর, বাকিদের খোঁজে চলছে মরণপণ তল্লাশি

West Bengal

-Ritesh Ghosh

দক্ষিণ ২৪ পরগনায় গভীর সমুদ্রে ট্রলার ডুবির ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৯ জন মৎস্যজীবীর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রায় আট দিন পর উদ্ধার হওয়া এই মৃতদেহগুলি মৎস্যজীবী মহলে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। একই সাথে এই মর্মান্তিক ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্যের কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তরফ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টের মাধ্যমে এই আর্থিক সহায়তার কথা জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে দুর্ঘটনায় মৃত মৎস্যজীবীদের নিকটাত্মীয়দের প্রত্যেককে এককালীন ২ লক্ষ টাকা এবং যারা আহত হয়েছেন তাঁদের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এই কঠিন সময়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলির পাশে থাকার এবং সমবেদনা জানানোর বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

Rescue personnel searching for missing fishermen at sea

দুর্যোগের কবলে ‘এফবি মা কালী’: কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা?

প্রশাসন ও স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার শঙ্করপুর মৎস্য বন্দর থেকে ১৫ জন মৎস্যজীবীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘এফবি মা কালী’ নামের ওই ট্রলারটি। গভীর সমুদ্রে মূলত ইলিশ ধরার উদ্দেশ্যেই পাড়ি দিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু মাঝ সমুদ্রে আবহাওয়া আচমকা অত্যন্ত খারাপ হয়ে পড়ায় ট্রলারটি বিপদে পড়ে। গত ৫ জুলাইয়ের পর থেকে সেই ট্রলারটির সঙ্গে সমস্ত রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ট্রলারের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকেই উপকূলের উদ্ধারকারী দলগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। সুন্দরবনের গোবর্ধনপুর থানার পুলিশ, রাজ্য বন দফতর এবং ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী যৌথভাবে সন্ধানকার্য শুরু করে। টানা আট দিন ধরে উত্তাল সমুদ্রে তল্লাশি অভিযানের পর অবশেষে নিখোঁজ ট্রলারটির খোঁজ পান তাঁরা। এই তল্লাশিতে স্থানীয় মৎস্যজীবী সমিতির নৌযানগুলিও উদ্ধারকারী বাহিনীকে ব্যাপক সাহায্য করেছিল।

রবিবার বকখালি উপকূল থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গভীর সমুদ্রে বাঘেরচর ও রক্তচরের মধ্যবর্তী এলাকায় ডুবে থাকা ট্রলারটিকে সনাক্ত করা হয়। উদ্ধারকারী দলগুলি বিশেষ তৎপরতা দেখিয়ে ডুবন্ত ট্রলারটিকে টেনে উদ্ধার করে গোবর্ধনপুরের সীতারামপুর উপকূলে নিয়ে আসে। সেখানে ট্রলারের সংলগ্ন কেবিন ও ডেকের ভিতর তল্লাশি চালাতেই পাওয়া যায় ৯ জন মৎস্যজীবীর প্রাণহীন দেহ। জলমগ্ন ট্রলারের ভিতর আটকে পড়াতেই তাঁদের এমন নির্মম পরিণতি হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

নিখোঁজদের সন্ধানে সমুদ্রের বুকে ড্রোন ও হেলিকপ্টার

নয়টি দেহ উদ্ধার করা গেলেও ট্রলারে থাকা বাকি ৬ জন মৎস্যজীবীর সন্ধান এখনও মেলেনি। তাঁদের জীবিত উদ্ধারের আশা অত্যন্ত ক্ষীণ হলেও নিখোঁজদের হদিশ পেতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী এবং জেলা প্রশাসন যৌথভাবে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠে নজরদারির পাশাপাশি আকাশপথেও তল্লাশির জোরদার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এই তল্লাশি অভিযানে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন থার্মাল ইমেজিং ড্রোন এবং বিশেষ হেলিকপ্টার নিয়োগ করা হয়েছে। আকাশ থেকে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলভাগের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন উপকূলরক্ষী বাহিনীর জওয়ানেরা। তবে বর্ষার মরসুমে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ, অনবরত বৃষ্টি ও সমুদ্রের গভীর জলস্রোতের কারণে উদ্ধারকাজ বারংবার ব্যাহত হচ্ছে। তাসত্ত্বেও প্রশাসনের উদ্ধারকারী দলগুলি নিখোঁজদের শেষ চিহ্নটুকু খুঁজে বের করতে এক মুহূর্তও বিরতি নিচ্ছেন না।

প্রতি বছরই বর্ষার এই মরসুমে উত্তাল সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে এমন দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় মৎস্যজীবীদের। এই ঘটনা উপকূলবর্তী অঞ্চলে মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা পরিকাঠামো নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল। আধুনিক ট্র্যাকিং ডিভাইস বা জিপিএস কমিউনিকেশন সিস্টেম জরুরি থাকা সত্ত্বেও কেন এমন বিপর্যয় এড়ানো যাচ্ছে না, তা নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।

উপকূলজুড়ে কান্নার রোল ও অনিশ্চয়তার দোলাচল

এই দুঃসংবাদ উপকূলের গ্রামগুলিতে পৌঁছতেই পূর্ব মেদিনীপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার মৎস্যজীবী পাড়াগুলিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। উদ্ধার হওয়া মৃত মৎস্যজীবীদের পরিবারে শুরু হয়েছে কান্নার রোল। যে সব মানুষেরা উপার্জনের তাগিদে মুখে হাসি নিয়ে সমুদ্রে গিয়েছিলেন, তাঁদের এমন নির্মম মৃত্যু যেন কেউই মেনে নিতে পারছেন না। স্বজনদের আকুল আর্তনাদ ও বুক ফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে সমুদ্রের চারপাশ।

অন্যদিকে, যে ছয়জন মৎস্যজীবী এখনও নিখোঁজ রয়ে গেছেন, তাঁদের পরিজনদের দিন কাটছে চরম আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তার দোলাচলের মধ্য দিয়ে। বাড়ির দাওয়ায় বসে পরিবারের সদস্যরা অপলক চোখে চেয়ে রয়েছেন সমুদ্রের দিকে, যদি কোনও ভালো খবর আসে। স্থানীয় প্রশাসনের আধিকারিক এবং মৎস্যজীবী সংগঠনের নেতারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির বাড়ি বাড়ি গিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এবং উদ্ধারকাজ নিয়ে প্রতিনিয়ত তাঁদের সর্বশেষ খবরাখবর দিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন।

Post Comment

You May Have Missed