প্রভিডেন্ট ফান্ডে পড়ে ‘দাবিহীন’ ৯,৩৩০ কোটি টাকা! আপনিও কি আছেন এই তালিকায়?

প্রভিডেন্ট ফান্ডে পড়ে ‘দাবিহীন’ ৯,৩৩০ কোটি টাকা! আপনিও কি আছেন এই তালিকায়?

Business

-Ritesh Ghosh

দেশের চাকরিজীবী ও শ্রমজীবীদের রক্ত জল করা উপার্জনের এক বিরাট অংশ পড়ে রয়েছে নিষ্ক্রিয় অবস্থায়। সম্প্রতি একটি তথ্য জানার অধিকার আইনের (আরটিআই) জবাবে সামনে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সারা দেশে ৩০.৯১ লক্ষেরও বেশি নিষ্ক্রিয় প্রভিডেন্ট ফান্ড (ইপিএফ) অ্যাকাউন্টে এখনও আটকে রয়েছে ৯,৩৩০ কোটি টাকারও বেশি দাবিহীন অর্থ। কেন্দ্রীয় সরকার যখন নতুন ইপিএফ স্কিম ২০২৬ চালু করে গ্রাহকদের লেনদেন আরও সহজ করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এই বিপুল পরিমাণ অলস পড়ে থাকা টাকা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চাকরি পরিবর্তন, ইউএএন (UAN) নম্বরের সংযুক্তিকরণ না করা এবং অনেক ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্টধারীর মৃত্যুর পর পরিবারের অজান্তেই এই টাকা বছরের পর বছর পড়ে থাকে। এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন (ইপিএফও) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ৩০,৯১,৮৬২টি এই ধরনের নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলিতে জমে থাকা মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৯,৩৩০ কোটি টাকা।

Digital representation of money stuck in inactive EPF accounts

এই বিশাল পরিমাণ দাবিহীন অর্থ উদ্ধারে সরকার এবং ইপিএফও দীর্ঘদিন ধরে নানা পদক্ষেপ করার কথা বললেও, বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত ধীরগতির। অথচ গত ২৯ জুন থেকেই গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কার্যকর হয়েছে নতুন ‘ইপিএফ স্কিম, ২০২৬’। এই নতুন পরিকাঠামোটি মূলত প্রায় আট কোটি সক্রিয় গ্রাহকের প্রভিডেন্ট ফান্ড সংক্রান্ত নিয়ম সহজ করতে এবং সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসতে চালু করা হয়েছে। এটি ১৯৫২ সালের পুরনো ইপিএফ স্কিমকে প্রতিস্থাপন করেছে।

পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, অলস পড়ে থাকা এই বিপুল তহবিলের সামান্য কিছু অংশ কমলেও মূল সমস্যার সমাধান এখনও মেলেনি। গত আর্থিক বছরের তুলনায় এই ক্ষেত্রে এক অতি সামান্য উন্নতি নজরে এসেছে। তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ নিষ্ক্রিয় পিএফ অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ৩১.৮৩ লক্ষ, যা পরবর্তী এক বছরে প্রায় ৯২ হাজার কমে ২০২৬ সালে ৩০.৯১ লক্ষে দাঁড়িয়েছে।

একইভাবে, নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্টে জমে থাকা দাবিহীন অর্থের পরিমাণও বেশ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ যেখানে দাবিহীন অর্থের পরিমাণ ছিল ১০,১৮১ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তা ৮৫১ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ৯,৩৩০ কোটি টাকায়। তবে এই গতিতে কাজ এগোলে সমস্ত গ্রাহকের হকের টাকা ফিরিয়ে দিতে আরও কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আর্থিক বছরের শেষ (৩১ মার্চ পর্যন্ত) নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাবিহীন অর্থের পরিমাণ (কোটি টাকায়)
২০২৫ ৩১.৮৩ লক্ষ ১০,১৮১ কোটি
২০২৬ ৩০.৯১ লক্ষ ৯,৩৩০ কোটি

সাধারণ মানুষের কাছে ৯,৩৩০ কোটি টাকার এই সংখ্যাটি হয়তো একটি সাধারণ পরিসংখ্যান মাত্র। কিন্তু দেশের বিভিন্ন বড় বড় জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে এই অর্থের বিপুল ক্ষমতা সহজে অনুধাবন করা সম্ভব। এই বিশাল অঙ্কের পড়ে থাকা টাকা দিয়ে অনায়াসেই দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেত।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১৬ সালে চালু হওয়া কেন্দ্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘উড়ান’ (UDAN) আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ যোজনায় সরকার এ পর্যন্ত মোট ১০,১৬৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। অর্থাৎ, নিষ্ক্রিয় পিএফ অ্যাকাউন্টে পড়ে থাকা টাকা এই প্রকল্পের খরচটির প্রায় সমান। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প ‘আয়ুষ্মান ভারত’ (PM-JAY)-এর ২০২৬-২৭ আর্থিক বছরের মোট বরাদ্দ বাজেটও এই অঙ্কেরই কাছাকাছি।

শিক্ষা ক্ষেত্রেও এই টাকা বিশাল অবদান রাখতে পারত। ২০১৪ সালের একটি সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে একটি নতুন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (আইআইটি) বা টেকনিক্যাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে খরচ হতো প্রায় ১,৭৫০ কোটি টাকা। মুদ্রাস্ফীতির হিসেব মাথায় রেখে ২০২৬ সালে যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৯৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই ৯,৩৩০ কোটি টাকার অলস অর্থ দিয়ে দেশে অনায়াসে ৩টি বিশ্বমানের আইআইটি গড়ে তোলা সম্ভব এবং তারপরেও প্রায় ৫০০ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকবে।

সমস্যার গভীরতা বোঝার জন্য ওই আরটিআই আবেদনে গত ছয় বছরের নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত বিশদ তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছিল। তবে ইপিএফও কর্তৃপক্ষ কেবল ২০২৫ এবং ২০২৬ আর্থিক বছরের তথ্য সরবরাহ করেছে। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ২০২৫-২৬ সালেই প্রথম ‘ইনঅপারেটিভ অ্যাকাউন্টস সেল’ (IAC) বা নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট তদারকি বিভাগ তৈরি করা হয়েছে এবং এর আগের বছর ধরে কোনও সমন্বিত তথ্য এই বিভাগের কাছে সংরক্ষিত নেই।

এছাড়াও, নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্টগুলির কতগুলি আধার কার্ডের সঙ্গে যুক্ত এবং স্বয়ংক্রিয় নিষ্পত্তির (auto-settlement) বর্তমান স্থিতি জানতে চাওয়া হলে ইপিএফও আইনি ধারা প্রয়োগ করে তথ্য দিতে অস্বীকার করে। তারা আরটিআই আইনের ধারা ৮(১)(ই) প্রয়োগ করে জানিয়েছে, এটি একটি বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্কের বিষয় এবং আইনের এই ধারা অনুযায়ী এই জাতীয় গোপন তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

এমনকী যে সমস্ত নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্টে ৫ লক্ষ টাকার বেশি সঞ্চয় রয়েছে, তাদের সংখ্যার হিসাবও দিতে পারেনি পিএফ কর্তৃপক্ষ। তাদের যুক্তি, এই নির্দিষ্ট বিন্যাসে কোনো ডেটাবেস রক্ষা করা হয় না। এই সমস্ত বিষয়গুলি থেকে স্পষ্ট যে, প্রভিডেন্ট ফান্ড নিয়মে ডিজিটাইজেশনের কথা বলা হলেও গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার ব্যাপারে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি কর্মজীবী মানুষের উচিত নিজের ইপিএফ অ্যাকাউন্ট সক্রিয় রাখা। চাকরি পরিবর্তন করার সঙ্গে সঙ্গে পুরনো এমপ্লয়ারের পিএফ ব্যালেন্স নতুন অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করতে হবে। বর্তমানের সার্বজনীন অ্যাকাউন্ট নম্বর (UAN) ব্যবস্থার ফলে গ্রাহকরা খুব সহজেই অনলাইনের মাধ্যমে বাড়ি বসেই তাদের সমস্ত অ্যাকাউন্টের টাকা এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে পারেন এবং এই বিশাল দাবিহীন তহবিলের ট্র্যাপ থেকে নিজেদের অর্থ বাঁচাতে পারেন।

যদিও নতুন সরকার-ঘোষিত ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং ইপিএফ স্কিম ২০২৬ হয়তো আগামী দিনে এই সমস্যাগুলির স্থায়ী রূপরেখা প্রস্তুত করবে, তবে তার আগে আমলাতান্ত্রিক ধীর গতি এবং তথ্যের অভাব দূর করা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ মানুষের কঠোর পরিশ্রমের টাকা যাতে কোনোভাবেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে না থাকে, তার জন্য ইপিএফও-কে আরও স্বচ্ছ ও তৎপর হতে হবে।

Previous post

বিনামূল্যে মিলবে জমির রেকর্ড, জমি মালিক ও কৃষকদের জন্য বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

Next post

Money Making Tips: অযত্নে বাড়া ঘাসেই লুকিয়ে লক্ষ্মীলাভের চাবিকাঠি! কীভাবে? কলেজ ছাত্রীদের মোটা আয়ের পথ দেখাচ্ছে মেদিনীপুর

Post Comment

You May Have Missed