ধ্বংসস্তূপের নিচে ১৯২ ঘণ্টা মরণপণ লড়াই! অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা এরনানের অবিশ্বাস্য গল্প

ধ্বংসস্তূপের নিচে ১৯২ ঘণ্টা মরণপণ লড়াই! অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা এরনানের অবিশ্বাস্য গল্প

International

-Ritesh Ghosh

মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি ও ইচ্ছাশক্তির কাছে মাঝে মাঝে বিজ্ঞান ও যুক্তির সমস্ত হিসাব-নিকাশ হার মেনে যায়। ঠিক এমনই এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থাকল ভেনেজুয়েলা। সেদেশের সাম্প্রতিক ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা আট দিন অর্থাৎ ১৯২ ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে থাকার পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৪৩ বছর বয়সী এক নিরাপত্তা রক্ষীকে। তাঁর নাম এরনান আলবার্তো জিল ফ্লোরেস। এই অবিশ্বাস্য উদ্ধার অভিযানটি এখন সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

গত ২৪ জুন ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর জেরে ধসে পড়া একটি বহুতল শপিং সেন্টারের বেসমেন্টে প্রায় ১৪০ টন ভাঙা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়েছিলেন এরনান। উদ্ধারকারীরা দীর্ঘ ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে অবিরাম কাজ করে অবশেষে বৃহস্পতিবার তাঁকে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে বের করে আনতে সক্ষম হন। এই ঘটনাটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝে এক চরম আশার আলো হিসেবে দেখছেন উদ্ধারকর্মীরা।

Rescue worker helping survivor from Venezuela earthquake rubble

ভেনেজুয়েলার এই ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই আড়াই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে এরনানের রক্ষা পাওয়া যেন চিকিৎসাবিজ্ঞান ও উদ্ধার প্রক্রিয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ধুলোবালিতে ধূসর এবং অক্সিজেন মাস্ক পরা এরনানকে যখন স্ট্রেচারে করে বাইরে বের করা হয়, তখন সেখানে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকারী ও স্বেচ্ছাসেবীদের চোখে আনন্দের অশ্রু দেখা গেছে।

শপিং সেন্টারের নাইট ডিউটিতে কর্মরত ছিলেন এরনান। প্রথম ভূকম্পনটি আঘাত হানার সময় তিনি একটি ছোট সিকিউরিটি কেবিনে অবস্থান করছিলেন। মূল বিশাল কংক্রিটের কাঠামোটি ধসে পড়লেও সৌভাগ্যবশত তাঁর কেবিনটি অক্ষত থেকে যায়। ওই কেবিনটিই উপর থেকে পড়া ভারী ধ্বংসাবশেষের হাত থেকে রক্ষা করে এরনানকে। কেবিনের ভেতরে একটি ছোট এয়ার পকেট তৈরি হওয়ায় সেখানে অক্সিজেনের সরবরাহ সচল ছিল।

সাধারণত যেকোনো দুর্যোগে প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সময়কে জীবিত মানুষ উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা আশাপ্রদ বলে মনে করা হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও আশা হারাননি উদ্ধারকারীরা। কোস্টারিকান রেড ক্রসের একটি বিশেষ দল প্রথম রবিবার এরনানের বেঁচে থাকার সংকেত পায়। এরপর কনক্রিটের ফাঁক দিয়ে কৌশলে তাঁর কাছে জল ও তরল পুষ্টিকর খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

এই উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে ছিল চিলির দমকল বাহিনীর একটি চৌকস দল। তাঁদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পর্তুগাল, মেক্সিকো, কোস্টারিকা, এল সালভাদর এবং ভেনেজুয়েলার স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলো। উদ্ধারকারীরা একটি অত্যাধুনিক টেলিস্কোপিক ক্যামেরার সাহায্যে সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ দিয়ে এরনানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। শেষ তিন দিন নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি সরু পাইপ দিয়ে তাঁকে গ্লুকোজ ও তরল খাবার সরবরাহ করা হয়।

অভিযানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল চিলির অভিজ্ঞ দমকলকর্মী ক্যাম্পোসের ভূমিকা। উদ্ধারকাজের শেষ কয়েক ঘণ্টায় তিনি অনবরত এরনানের সঙ্গে কথা বলে তাঁর মানসিক শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করেছিলেন। উদ্ধারের ঠিক আগে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, সুড়ঙ্গের ভেতর বসে এরনান ছবি আঁকছেন। ক্যাম্পোস তাঁকে চোখে ধুলোবালি যাওয়া এড়াতে প্রতিরক্ষামূলক চশমা বা গগলস পরার পরামর্শ দিচ্ছিলেন।

এরনানের জীবন রক্ষার পেছনে যে উদ্বেগ ও ভালোবাসা জড়িয়ে ছিল, তা যেকোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। কোস্টারিকান রেড ক্রসের উদ্ধারকর্মী মিনইয়ার কোলাডো জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে যখন প্রথমবার এরনানকে খুঁজে পাওয়া যায়, তখন তিনি উদ্ধারকারীদের অনুরোধ করেছিলেন তাঁর স্ত্রীকে এই মুহূর্তে না জানাতে। তিনি আশঙ্কা করছিলেন, ধসে পড়া সুড়ঙ্গ পেরিয়ে তিনি যদি শেষ পর্যন্ত জীবিত বেরিয়ে আসতে না পারেন, তবে তাঁর স্ত্রী দ্বিগুণ কষ্ট পাবেন।

তবে শেষ পর্যন্ত এরনানের স্ত্রী গুসবিমার গঞ্জালেস স্বামীর এই অলৌকিক প্রত্যাবর্তনে উচ্ছ্বসিত। ৮ ও ১০ বছর বয়সী দুই সন্তানের জননী গুসবিমার বলেন, দীর্ঘ কয়েক দিন ধরে তিনি গভীর হতাশায় ডুবে ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারলেন তাঁর স্বামী জীবিত আছেন, তখন সমস্ত অন্ধকারের মাঝে যেন এক চিলতে আলোর সন্ধান পেলেন। স্বামীর ফিরে আসাকে তিনি ঈশ্বরের এক পরম আশীর্বাদ বলে মনে করছেন।

গত ২৪ জুন ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার এই দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলকে ব্যাপকভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লা গুয়াইরা রাজ্য। ভূমিকম্প প্রতিরোধী ব্যবস্থার অভাব এবং উদ্ধারকাজে ধীরগতির জন্য অনেক নাগরিক দেশের সরকারের তীব্র সমালোচনা করছেন। এই ব্যাপক ক্ষোভের মধ্যেই দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই উদ্ধার অভিযানকে মানবতার বড় বিজয় বলে স্বাগত জানিয়েছেন।

দুর্যোগের বড় আঘাতের মাঝে এই উদ্ধারযজ্ঞ ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় সান্ত্বনা হয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংহতি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঠিক ব্যবহারে কীভাবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করা যায়, এরনানের বেঁচে ফেরা তারই প্রমাণ। কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই দেশটিতে এখন শুধু ধ্বংসের হাহাকার নয়, বরং এরনানের এই নতুন জীবন লাভের গল্প আগামী দিনে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জোগাবে।

Post Comment

You May Have Missed