মোদী যতদিন ক্ষমতায়, ভারত আক্রান্ত হলে পাশে থাকবে আমেরিকা! বড় ঘোষণা ট্রাম্পের
International
-Ritesh Ghosh
ফ্রান্সে আয়োজিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের প্রতি তাঁর দেশের দৃঢ় ও দ্ব্যর্থহীন সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যতক্ষণ এদেশের নেতৃত্বে থাকবেন, ভারত আক্রান্ত হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব উপায়ে পাশে দাঁড়াবে।
দীর্ঘ ১৬ মাস পর দুই বিশ্বনেতার মধ্যে এটাই ছিল প্রথম মুখোমুখি বৈঠক। দুই নেতার এই সাক্ষাৎ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে ঘটল, বিশেষ করে ২০২৫ সালের মে মাসে সংঘটিত ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর এটিই তাঁদের প্রথম গভীর রাজনৈতিক আদানপ্রদান। এই বৈঠক ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন দূর করতে বড় ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বৈঠক শেষে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ কায়দায় প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রতি গভীর ভরসা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “নরেন্দ্র মোদী যতক্ষণ ক্ষমতায় আছেন এবং এই সময়ে যদি ভারতের ওপর কোনও বহিরাগত আক্রমণ ঘটে, তবে আমেরিকা সেখানে সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকবে।” আমেরিকার এই প্রত্যক্ষ সমর্থন নয়াদিল্লির প্রতিরক্ষা নীতির ক্ষেত্রে একটি বড় কূটনৈতিক জয়ের সমতুল্য বলে বোদ্ধারা মনে করছেন।
নমনীয় কিন্তু দৃঢ় কূটনীতির বার্তা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “যদি কেউ ওই বিশেষ মানুষটিকে আক্রমণ করার দুঃসাহস দেখায়, তবে আমরা চুপ করে বসে থাকব না।” অবশ্য এর ঠিক পরেই উপস্থিত সাংবাদিকদের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যোগ করেন, “তবে যদি অন্য কেউ ভারতের দায়িত্বে আসেন, সেক্ষেত্রে আমি আমেরিকার সমর্থনের বিষয়ে এতটা নিশ্চিত হতে পারছি না।”
প্রধানমন্ত্রী মোদীর অনন্য নেতৃত্ব এবং জটিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনার দক্ষতারও ব্যাপক প্রশংসা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাণিজ্যিক কঠোরতার প্রতি ইঙ্গিত করে ডোনাল্ড ট্রাম্প নরেন্দ্র মোদীকে একজন অত্যন্ত কঠিন দরকষাকষিকারী হিসেবে বর্ণনা করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প আশাপ্রকাশ করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী মোদীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ভারত অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক দিক থেকে আগামীতে অভাবনীয় সমৃদ্ধি অর্জন করবে।
এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পটভূমি হিসেবে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের চালানো ‘অপারেশন সিঁদুর’ অন্যতম প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। ওই বছরের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে একটি নৃশংস জঙ্গি হামলায় ২৬ জন ভারতীয় নাগরিকের প্রাণহানি ঘটে। এর কড়া প্রত্যুত্তরে ৭ই মে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী পাকিস্তান ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী কাঠামোর ওপর একযোগে নিখুঁত বিমান হামলা চালায়।
দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার এই সামরিক উত্তেজনা প্রায় ৮৮ ঘণ্টা ধরে অবিরাম চলেছিল। অবশেষে ১০ই মে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে বাধ্য হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প সেসময় দাবি করেছিলেন যে মার্কিন মধ্যস্থতায় এই রফা হয়েছিল। যদিও ভারত দৃঢ়ভাবে স্পষ্ট করেছিল যে, এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক স্তরে নেওয়া হয়েছিল এবং এতে কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছিল না।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের ভারতের ওপর পণ্য রপ্তানি শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত, ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের ভিসা ও অভিবাসন নিয়ে কড়াকড়ি এবং ওমান উপকূলে ও সংলগ্ন এলাকায় তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর মতো স্পর্শকাতর বিষয় জটিলতা বাড়িয়েছিল। ফলে, এভিয়ান-লে-বাঁ-এর বৈঠকটির মূল লক্ষ্যই ছিল অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সম্মানজনক সমাধান বের করা।
সম্প্রতি পারস্য উপসাগরে ওমানের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন সামরিক হামলার ঘটনায় তিন ভারতীয় নাবিকের নির্মম মৃত্যু হয়েছিল। এই অনভিপ্রেত ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। নয়াদিল্লি মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে দু’বার ফরেন অফিসে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানায়। এই সংবেদনশীল বিষয়েও ট্রাম্প বৈঠকে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
নাবিকদের মৃত্যুর প্রসঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “আমি এই ঘটনার কথা শুনেছি। এটি সত্যিই একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। আমরা এই পরিস্থিতি সংশোধনে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।” এর আগে মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও ভারত সফর করে সম্পর্কের ক্ষত মেরামতের যে ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন, ট্রাম্পের এই দুঃখপ্রকাশ দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে নতুন বাতাস দিল।
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই প্রধানমন্ত্রী মোদী সেখানে যান। সেই উষ্ণ দ্বিপাক্ষিক সফরের পর এবারই প্রথম দুই নেতা মুখোমুখি হলেন। বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জটিলতা বজায় থাকলেও, দুই দেশই যে নিজেদের বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন স্তরে নিয়ে যেতে চায়, এদিনের সফল আলোচনা তারই প্রমাণ।
ফ্রান্সের এই ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি করল। ট্রাম্পের স্পষ্ট আশ্বাস এবং মোদীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। গভীর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আমেরিকা ও ভারত যে এখনও পরস্পরের অপরিহার্য শরিক, তা এদিনের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে।



Post Comment