মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অবসান? ইরান-আমেরিকার ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি বাস্তবে সম্পন্ন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অবসান? ইরান-আমেরিকার ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি বাস্তবে সম্পন্ন

International

-Ritesh Ghosh

পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিনের অশান্তি ও যুদ্ধের চরম উত্তেজনার অবসান ঘটাতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর আমন্ত্রণে ভার্সাই প্রাসাদে আয়োজিত এক নৈশভোজের পর ইরানের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সই করার কথা সশরীরে নিশ্চিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এই আচমকা ঘোষণা এবং হোয়াইট হাউসের তরফ থেকে আসা আনুষ্ঠানিক বিবৃতির পর নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের আশার আলো দেখছে বিশ্ব কূটনীতি।

এই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তিটি মূলত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামে আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সরকারিভাবে জানিয়েছেন, দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের চূড়ান্ত স্বাক্ষরের পর এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়েছে। হোয়াইট হাউস সূত্রের খবর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই সমঝোতা পত্রে গত রবিবারেই ডিজিটাল স্বাক্ষর করেছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রধান আলোচক মহম্মদ বাঘের গালিবাফ।

Donald Trump and Iranian officials signing historical peace agreement

এর আগে সুইজারল্যান্ডে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরের একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করার কথা জানিয়েছে তেহরান। তবে আনুষ্ঠানিক কোনো উৎসব বা জমকালো অনুষ্ঠান না হলেও চুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে বলবৎ রয়েছে এবং উভয় পক্ষই এর ধারাগুলি মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে বড় ধরণের প্রভাব ফেলবে।

এই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হল পশ্চিম এশিয়ার রণক্ষেত্রকে চিরতরে শান্ত করা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি সরবরাহের অস্থিরতা দূর করা। খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, বিগত কয়েক মাস ধরে দুই পক্ষের অবরোধের কারণে বন্ধ থাকা সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত দ্রুততার সাথে খুলে দেওয়া হবে। এই অতীব সংবেদনশীল নৌপথটি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল।

হরমুজ প্রণালীটিকে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে সেখানে ইতিপূর্বে বসানো সমস্ত সামুদ্রিক মাইন সরাতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটন এই চুক্তির অধীনে ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপানো ব্যাপক তেল সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নিতে সম্মত হয়েছে। তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় ইরানের ধুঁকতে থাকা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি আবার দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ পাবে এবং দেশটি বিশ্ববাজারে স্বাভাবিক বাণিজ্য শুরু করতে পারবে।

চুক্তির অন্যান্য প্রধান শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করা। পরমাণু বিষয়টিতে স্থায়ী সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদে অর্জন করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বড় আঞ্চলিক সাহায্য তহবিল গঠন করতে সাহায্য করবে মার্কিন প্রশাসন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে, এই তহবিলে মার্কিন করদাতাদের কোনো অর্থ দেওয়া হবে না এবং ইরানকে এই সুবিধে পেতে হলে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে ভালো আচরণ বজায় রাখতে হবে।

এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার বিভিন্ন ব্যাঙ্কে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পত্তি ইরানকে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট অতীতে একাধিকবার এই অবরুদ্ধ পরমাণু-সম্পর্কিত অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি নাকচ করে দিয়েছিলেন। তবে বর্তমানের কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ব বাজারে মার্কিন ডলারের প্রতি আন্তর্জাতিক লগ্নিকারীদের বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রাখতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পুরনো কঠোর অবস্থানের পরিবর্তন করেছেন।

ট্রাম্পের যুক্তি অনুযায়ী, আমেরিকা যদি এভাবে চিরতরে অন্য দেশের বৈধ সম্পদ আটকে রাখে, তবে কোনো আন্তর্জাতিক শক্তি আর মার্কিন ডলার বা মুদ্রা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে চাইবে না। তবে নরম সুরের পাশাপাশি তেহরানকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছেন তিনি। ট্রাম্প সাফ জানিয়েছেন, ইরানি নেতৃত্ব যদি এই চুক্তির শর্তাবলী বা আঞ্চলিক শান্তিশৃঙ্খলা বিন্দুমাত্র ভঙ্গ করার চেষ্টা করে, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে পুনরায় বিধ্বংসী সামরিক বিমান হামলা চালাতে দ্বিধা করবে না।

পশ্চিম এশিয়ার হিংসা থামানোর এই নতুন কূটনৈতিক মোড় বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির ময়দানে তুমুল প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কয়েক দশকের চলমান বৈরিতার চিরচেনা সম্পর্কের বরফ এই ঐতিহাসিক দস্তাবেজের মাধ্যমে কতটা গলবে, তা সময়ই প্রমাণ করবে। ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইরানের পরবর্তী গতিবিধির ওপর এই চুক্তির ভবিষ্যৎ ঝুলে থাকবে, এবং শর্তভঙ্গ হলে তাৎক্ষণিকভাবে সমস্ত সুবিধা রদ ও বাতিল করা হবে।

সব মিলিয়ে, এই ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি বাজারগুলোতে ইতিবাচক সুফল বয়ে আনবে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মহল আশা প্রকাশ করছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অনিয়ন্ত্রিত দাম নিয়ন্ত্রণে আসা এবং বাণিজ্য রুটগুলো সুরক্ষিত করতে এই প্রয়াস বড় ভূমিকা রাখবে। মার্কিন ও ইরানি নেতৃত্বের এই অপ্রত্যাশিত কূটনৈতিক সমঝোতা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে যুদ্ধ এড়াতে আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের এক নয়া অধ্যায় উন্মোচন করল।

Post Comment

You May Have Missed