পাকিস্তানের ডেরা থেকে ভারতের বিরুদ্ধে ছক! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তালিকায় ২৩ কুখ্যাত জঙ্গি
India
-Ritesh Ghosh
সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিল ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। পাকিস্তানের মাটি থেকে ভারতের বিরুদ্ধে নাশকতা চালানো মোট ২৩ জন কুখ্যাত অপারেটিভকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ব্যক্তিগত জঙ্গি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে কেন্দ্র। লস্কর-ই-তৈবা (এলইটি), জৈশ-ই-মহম্মদ (জেইএম) এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এই সমস্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ চালানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনের (ইউএপিএ) ধারা ৩৫-এর অধীনে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। জারি করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একাধিক গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে এই ২৩ জন পলাতক অপরাধীর নাম এখন থেকে ভারতের কঠোরতম সন্ত্রাসবিরোধী আইনের চতুর্থ তফশিলের অন্তর্ভুক্ত হল, যা তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি বড় হাতিয়ার।

সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই তালিকায় অন্যতম প্রধান নাম হল মাসুদ ইলিয়াস কাশ্মীরি। সে মূলত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জৈশ-ই-মহম্মদের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসেবে পরিচিত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, বর্তমানে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন জম্মু ও কাশ্মীরের (PoJK) রাওয়ালকোটকে নিজের ঘাঁটি বানিয়ে সে দিনের পর দিন ভারতের বিরুদ্ধে জঙ্গি নিয়োগ ও নাশকতার ছক কষে চলেছে।
তদন্তকারী সংস্থাগুলি জানিয়েছে, মাসুদ ইলিয়াস কাশ্মীরি শুধুমাত্র জঙ্গি নিয়োগেই সীমাবদ্ধ নয়, সে কাশ্মীর উপত্যকায় অনুপ্রবেশের পথ তৈরি ও অস্ত্র সরবরাহেও মুখ্য ভূমিকা নেয়। বিশেষত, ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল জম্মুতে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর যে প্রাণঘাতী জঙ্গি হামলা হয়েছিল, তার নেপথ্যে ছিল এই মাসুদের মস্তিষ্ক। একাধিক নাশকতামূলক হামলায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনার সঙ্গে তার সরাসরি যোগ রয়েছে।
ইউএপিএ-র তালিকায় যুক্ত হওয়া ২৩ সন্ত্রাসবাদী
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তিতে যে সমস্ত জঙ্গির নাম প্রকাশ করা হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই পাকিস্তান থেকে জম্মু-কাশ্মীরে অস্থিরতা তৈরির কাজে সরাসরি যুক্ত। এদের মূল লক্ষ্যই হল কাশ্মীর উপত্যকার যুবসমাজকে ভুল পথে চালিত করে নাশকতামূলক কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া। তদন্তকারীদের মতে, এই তালিকায় কেবল মাঠপর্যায়ের কর্মী নয়, রয়েছে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলির প্রথম সারির মাথা ও নীতি-নির্ধারকেরা।
| সন্ত্রাসবাদীর নাম | জঙ্গি সংগঠন ও বর্তমান অবস্থান |
|---|---|
| মাসুদ ইলিয়াস কাশ্মীরি | জৈশ-ই-মহম্মদ (JeM), রাওয়ালকোট, পাক-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীর |
| মহম্মদ মুসাদ্দিক | সীমান্তপারের জঙ্গি নেটওয়ার্কের প্রধান পরিচালক ও নিয়োগকারী |
| মুফতি মহম্মদ আসগর খান | জৈশ-ই-মহম্মদের প্রভাবশালী তাত্ত্বিক নেতা ও মডিউল প্রধান |
| হাফিজ খালিদ ওয়ালিদ | লস্কর-ই-তৈবার উচ্চপদস্থ কমান্ডার ও উপত্যকায় নাশকতার নির্দেশক |
| বিলাল আহমদ মীর | কাশ্মীর উপত্যকায় অর্থ সংগ্রহ ও অস্ত্র পাচারে যুক্ত সক্রিয় অপারেটিভ |
| আব্দুল রউফ | সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশের রাস্তা নিয়ন্ত্রণ ও ছদ্মবেশী অর্থ সংগ্রাহক |
প্রকাশিত তালিকায় থাকা অন্য ১৭ জন ঘাতকও পাকিস্তানি মদতে পুষ্ট নেটওয়ার্কের অধীনে কাজ করছে। এদের মধ্যে রয়েছেন হাফিজ আব্দুল শাকুর, আবদুল্লা জেহাদি, ফিরদৌস আহমদ ভাট, গুলাম ফরিদ, আবিদ কয়ূম লোন, নাজির আহমেদ গুজ্জর, আসফাক আহমদ, মৌলানা সইফুল্লা খালিদ, মহম্মদ ইয়াকুব, মৌলানা ইউসুফ তৈবি, ওয়াইস ফারোজ, কারি ইয়াকুব শেখ, রানা ইফতিখার, ওয়াসিম নূর জাট, মহম্মদ শহিদ ফয়সাল, মৌলানা ইমদাদ উল্লাহ মক্কি এবং হারুন রশিদ গানাই।
কেন এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের মাটিতে আশ্রয় নিয়ে থাকা জঙ্গিদের নাম আলাদাভাবে সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা অত্যন্ত বড় কৌশলগত জয়। অতীতে ইউএপিএ আইনের অধীনে শুধুমাত্র কোনও গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সম্ভব হতো। কিন্তু ২০১৯ সালের আইন সংশোধনের পর কেন্দ্রকে কোনও ব্যক্তিকে এককভাবে ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, এবার তারই পূর্ণ প্রয়োগ ঘটানো হল।
এই বিশেষ তকমা দেওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় স্তরে এদের অপরাধের পরিধিকে চিহ্নিত করা সহজ হবে। এটি ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ (NIA)-কে দেশ জুড়ে থাকা এদের গুপ্ত আস্তানা ও ছদ্মবেশী সাহায্যকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে আইনি স্বাধীনতা দেয়। এর ফলে ওই জঙ্গিদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা এবং তাদের ছদ্মবেশী রিয়েল এস্টেটসহ অন্যান্য সম্পদ ক্রোক করা সম্ভব হবে।
নয়াদিল্লির এই কড়া বার্তার মূল উদ্দেশ্য হল, ভারতে সক্রিয় ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কারদের কোণঠাসা করা। যারা সীমান্তপারের এই হ্যান্ডলারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভারতের মাটিতে নাশকতা চালায় বা যুবসমাজকে বিভ্রান্ত করে নতুন নাশকতার জাল বোনে, তাদের ওপর এটি এক বড় ধাক্কা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক মনে করছে, এর ফলে জম্মু-কাশ্মীরে সন্ত্রাস ছড়ানোর মূল আর্থিক নেটওয়ার্কটি ভেঙে পড়বে।
পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির কৌশল
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রসংঘ সহ একাধিক বিশ্বমঞ্চে দাবি করে আসছে যে, পাকিস্তান তাদের মাটিকে সন্ত্রাসবাদের নিরাপদ রাজত্ব হিসেবে ব্যবহার করতে সুবিধা দিচ্ছে। লস্কর এবং জৈশের মতো কুখ্যাত সংগঠনগুলি খাতায়-কলমে পাকিস্তানে নিষিদ্ধ হলেও, তাদের শীর্ষ নেতারা ছদ্মনামে সেখানে প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়ায় এবং ভারতের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ফলে পাকিস্তানের সেই দ্বিচারিতা আন্তর্জাতিক মহলে আবার ফাঁস হয়ে গেল।
ভারতীয় গোয়েন্দাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন রিপোর্টে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, কাশ্মীর উপত্যকায় কড়া নজরদারির কারণে এখন জঙ্গিরা জম্মু অঞ্চলের পীর পঞ্জাল পর্বতমালার দক্ষিণে ড্রোন বা অনুপ্রবেশের মাধ্যমে অস্ত্র ও মাদক পাঠাচ্ছে। এই নতুন তালিকায় থাকা অনেক অপারেটিভই এই ড্রোনের মাধ্যমে অস্ত্র ও জাল নোটের চোরাচালানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থেকে উপত্যকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চাইছে।
সীমান্তপারে পালিয়ে থাকা এই ২৩ জন সন্ত্রাসবাদীর বিরুদ্ধ ভারতের এই জোরালো আইনি লড়াই প্রমাণ করে যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দিল্লির নীতি অত্যন্ত দৃঢ় ও আপসহীন। দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক যে প্রতিনিয়ত কঠোরতম আইনি পথ বেছে নিচ্ছে, তা এই তালিকা প্রকাশের সিদ্ধান্তেই সুনির্দিষ্ট হয়েছে। আগামী দিনে এদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যেই ভারত নিজের তৎপরতা আরও বহুগুণ বাড়াবে।



Post Comment