ওবিসি সংরক্ষণ ও কমিশনের নিয়মে বড় রদবদল, নবান্নের জোড়া বিলে কী কী পরিবর্তন?
West Bengal
-Ritesh Ghosh
পশ্চিমবঙ্গের অনগ্রসর শ্রেণির সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিধানসভায় এক সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। ওবিসি সংরক্ষণ এবং অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের সামগ্রিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে রাজ্য বিধানসভায় একযোগে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিল পেশ করা হয়েছে। অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষের হাত ধরে বিধানসভায় পেশ হওয়া এই জোড়া বিল ঘিরে ইতিমধ্যেই নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চর্চা শুরু হয়েছে।
রাজ্য প্রশাসনের এই নতুন উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংস্কার। তৃণমূল জমানার পূর্ববর্তী আইনগুলিকে যুগের উপযোগী করে তুলতে প্রথমত আনা হচ্ছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (আদার দ্যান এসসি অ্যান্ড এসটি) (রিজার্ভেশন অফ ভ্যাকেন্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্টস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’। এই বিলের লক্ষ্য হল ২০১২ সালের মূল সংরক্ষণ বিধিকে সংশোধন করা। এর পাশাপাশি পেশ করা হয়েছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিশন ফর ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’।

১৯৯৩ সালের মূল অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন আইনটির যুগোপযোগী সংস্কারের মাধ্যমে এই কমিশনকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করছে রাজ্য সরকার। সরকারি সূত্রের খবর, কমিশনের কাজে আরও গতি আনতে এবং এর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে জটিলতামুক্ত করতেই এই পদক্ষেপে উদ্যোগী হয়েছে নবান্ন। এই বিলের ফলে কমিশনের আইনি এক্তিয়ার এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ নিরসনের ক্ষমতা অনেকটাই স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হতে চলেছে বলে মত প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের।
নতুন সংশোধনী বিলের খসড়া অনুযায়ী, অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের সদস্য-সচিব তথা মেম্বার-সেক্রেটারি পদের যোগ্যতায় বড় ধরনের রদবদল আনা হচ্ছে। বর্তমানের চালু নিয়ম অনুযায়ী, কমিশনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সদস্য-সচিব পদে রাজ্য সরকারের ‘সেক্রেটারি’ বা পূর্ণ সচিব পদমর্যাদার কোনো সিনিয়র আমলাকে নিয়োগ করতে হতো। কিন্তু প্রস্তাবিত সংশোধনীর ক্ষমতা খাটানো হলে, এবার থেকে রাজ্য সরকারের ‘জয়েন্ট সেক্রেটারি বা তার ঊর্ধ্বতন’ কোনো আধিকারিককে এই পদে সরাসরি বসানো যাবে।
এর ফলে যোগ্য আমলা নিয়োগের বিষয়টি আরও সহজ ও নমনীয় হবে বলে নবান্নের নীতি নির্ধারকদের আশা। একই সাথে, নতুন নিয়মে কমিশনের অন্যান্য সদস্যদের কাজের মেয়াদকালও অত্যন্ত নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। বিলে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের প্রত্যেক মনোনীত সাধারণ সদস্য তাঁর সংশ্লিষ্ট পদ গ্রহণের দিন থেকে হিসাব করে গুনে গুনে পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।
তবে রাজ্য সরকারের নিয়মিত চাকুরিজীবী কোনো আধিকারিক যদি সদস্য-সচিব পদে কর্মরত থাকেন, তবে তাঁর কার্যকালের মেয়াদ নিয়ে একটি বিশেষ বিকল্প রাখা হয়েছে। তাঁর কাজের মেয়াদ কত দিনের হবে, তা সম্পূর্ণভাবে রাজ্য সরকারের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন ও বিশেষ নির্দেশিকার ওপরেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কমিশনের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করার ক্ষেত্রে নবান্নের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনগত সুবিধা আগের চেয়ে অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।
নতুন পরিকাঠামোয় এই কমিশনের প্রধান প্রধান ক্ষমতা ও আইনি দায়িত্বগুলিকে আরও বেশি পরিচ্ছন্ন ও ধারালো করা হচ্ছে। রাজ্যের কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে অনগ্রসর ওবিসি তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা যাবে কি না, তা নিয়ে যদি দাবি ওঠে, তবে কমিশন সরাসরি সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যানুসন্ধান এবং গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারবে। বিশদ বিশ্লেষণের পর কমিশন রাজ্য সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বিশেষ পরামর্শ দেবে।
এর পাশাপাশি, এতদিন অনগ্রসর শ্রেণির তালিকায় কোনো বিশেষ সম্প্রদায়কে অতিরিক্ত অন্তর্ভুক্ত বা ‘ওভার-ইনক্লুশন’ করা অথবা যোগ্য গোষ্ঠীগুলিকে তালিকাভুক্ত না করে বাইরে রাখার মতো বিষয়ে সাধারণ নাগরিকেরা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করতেন। নতুন বিলের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই দুই ধরনের বিষয় যেমন যোগ্য গোষ্ঠীর না থাকা তথা ‘আন্ডার-ইনক্লুশন’ কিংবা অযোগ্য গোষ্ঠীর বেশি অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সরাসরি নাগরিকদের অভিযোগ শুনবে এই ক্ষমতাপ্রাপ্ত ওবিসি কমিশন।
এই ধরনের সংবেদনশীল নাগরিক অভিযোগের নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেওয়ার মাধ্যমে ওবিসি কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বাড়বে। সাধারণ মানুষের যেকোনো সমস্যা নথিসহ কমিশনের সামনে সরাসরি পেশ করার পথ সুগম হবে। এর ফলে সরকারি চাকরিতে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সংরক্ষণের নিয়মগুলির সঠিক প্রয়োগ নিয়ে জনমানসে স্বচ্ছতা তৈরি হবে এবং যোগ্য ব্যক্তিরা যথাসময়ে উপযুক্ত সংরক্ষণের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন।
| মূল ক্ষেত্র ও প্রস্তাবিত সংশোধনীর চালচিত্র | বর্তমান বা পুরনো ব্যবস্থা | প্রস্তাবিত নতুন সংশোধনীর রূপরেখা |
|---|---|---|
| সদস্য-সচিব পদের যোগ্যতা | আইন অনুযায়ী কেবল ‘সচিব’ বা সেক্রেটারি পদমর্যাদার আমলা। | আকার ছোট করে ‘যুগ্ম সচিব বা তার সমমানের ঊর্ধ্বের’ অফিসারকে দেওয়ার ব্যবস্থা। |
| কমিশনের সদস্যদের নির্দিষ্ট মেয়াদ | সদস্যদের চূড়ান্ত মেয়াদের নির্দিষ্ট আইনি সীমাবদ্ধতা নিয়ে স্পষ্টতা ছিল না। | দায়িত্ব গ্রহণ বা পদভার নেওয়ার দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী টানা ৩ বছর। |
| কর্মরত সরকারি সদস্য-সচিবের মেয়াদ | মেয়াদ সংক্রান্ত নিয়ম সম্পূর্ণভাবে আলাদা ছিল বা স্পষ্টতা ছিল না। | রাজ্য সরকারের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন ও নির্দেশিকার ভিত্তিতে মেয়াদকাল নির্ধারণ। |
| অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগ শুনানি | তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত অভিযোগ শোনার সুনির্দিষ্ট আইনি ক্ষেত্র সংকীর্ণ ছিল। | অতিরিক্ত অন্তর্ভুক্তি (ওভার-ইনক্লুশন) বা বঞ্চিতদের অভিযোগ (আন্ডার-ইনক্লুশন) সরাসরি সমাধান। |
আইনজ্ঞদের একাংশের মতে, রাজ্যে ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে বিগত কয়েক বছরে নানা ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল, যা সরাসরি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এই সংশোধনী বিল দুটি পাসের মাধ্যমে রাজ্য সরকার আইনিভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ় অবস্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওবিসি কমিশন স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে এবং নিজস্ব পরিকাঠামোয় অভিযোগ নিষ্পত্তির সরাসরি সুযোগ পেলে, আগামী দিনে ওবিসি সংরক্ষণ ব্যবস্থা আরও অবাধ ও ত্রুটিহীনভাবে কার্যকরী করা সম্ভব হবে।
রাজ্য বিধানসভায় জোড়া সংশোধনী বিল পেশ করার এই তৎপরতা পশ্চিমবঙ্গের অনগ্রসর শ্রেণির কল্যাণের ক্ষেত্রে একটি বড় মোড় হতে চলেছে। এখন দেখার বিষয়, বিধানসভায় বিল পাশের পর এবং রাজ্যপালের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে এটি কত দ্রুত সম্পূর্ণ আইনি রূপ ধারণ করে। নবান্ন সূত্রের ইঙ্গিত, নতুন আইন লাগু হওয়ার সাথে সাথেই শূন্যপদে ওবিসি সদস্য নিয়োগ এবং কমিশনের কাজের আধুনিকীকরণ অবিলম্বে শুরু করে দেওয়া সম্ভব হবে।



Post Comment