বিধানসভায় পেশ হতে চলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি! ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে কোন পরিকল্পনা শুভেন্দু সরকারের?

বিধানসভায় পেশ হতে চলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি! ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে কোন পরিকল্পনা শুভেন্দু সরকারের?

West Bengal

-Ritesh Ghosh

পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) বিল আনতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে নতুন রাজ্য সরকার। আগামী সোমবারই শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা এই বিলটি বিধানসভায় পেশ করতে চলেছে। বিজেপির দীর্ঘদিনের এই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রশাসনের অন্দরে জোরকদমে তৎপরতা শুরু হয়ে গিয়েছে।

ক্ষমতায় আসার পর সরকারের প্রথম একশো দিনের কর্মসূচির অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল এই আইনটি কার্যকর করা। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলীয় ইস্তেহারে স্পষ্ট করা হয়েছিল যে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বলবৎ করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর জনসভার প্রতিশ্রুতি মনে রেখে এখন সেই লক্ষ্যে দ্রুত পা বাড়াচ্ছে নবান্ন।

West Bengal Assembly discussing Uniform Civil Code bill

ইতিমধ্যেই দেশের একাধিক বিজেপি শাসিত রাজ্যে এই দেওয়ানি বিধি কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উত্তরাখণ্ড বিধানসভায় এই আইন আগেই পাস হয়েছে। অন্যদিকে অসম ও গুজরাতের মতো রাজ্যগুলিও একই পথে হাঁটছে। সম-আইন এবং লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণের বার্তা দিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য দুই স্তরের নেতৃত্বই এই আইন চালুর সপক্ষে সওয়াল করে আসছে।

আসলে কী এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি?

সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করলে, দেওয়ানি আইনের এই অভিন্ন রূপটি দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য প্রযোজ্য এক সাধারণ বিধি। বর্তমান ভারতের আইনি ব্যবস্থায় ফৌজদারি বিধি সবার জন্য এক হলেও, পারিবারিক বিষয়গুলিতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন বা ‘পার্সোনাল ল’ অনুযায়ী বিচার চালিত হয়। প্রস্তাবিত নতুন বিধি কার্যকর হলে এই ব্যবস্থার আমূল বদল ঘটবে।

সোমবারের এই বিলটি পাস হলে সাধারণ মানুষের সামাজিক জীবনে বড় ধরনের বদল আসবে। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তির ওপর সন্তানের অধিকার তথা উত্তরাধিকার বন্টন, সন্তান দত্তক নেওয়া এবং লিভ-ইন সম্পর্কের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলি আর কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলবে না। সে ক্ষেত্রে দেশের সংবিধান নির্দেশিত একটি অভিন্ন আইনেই সব ফয়সালা হবে।

এই আইনের সবচেয়ে বড় সমাজতাত্ত্বিক দিক হল লিঙ্গভিত্তিক সমতা প্রতিষ্ঠা করা। বিভিন্ন ব্যক্তিগত আইনে নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে নানা অসমতা লক্ষ্য করা যায়, বিশেষত সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার এবং বিবাহবিচ্ছেদের পর খোরপোশ পাওয়ার ক্ষেত্রে। ইউসিসি বলবৎ হলে সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে নারীরা আইনি ক্ষেত্রে সমমর্যাদা ও অধিকারের সুযোগ পাবেন বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক লড়াই

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দেওয়ানি বিধি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। বিধানসভা নির্বাচনের সময় নির্বাচনী প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং মুর্শিদাবাদের জনসভা থেকে বাংলায় ইউসিসি চালুর ঘোষণা করেছিলেন। দলের ‘সংকল্প পত্রে’ এই প্রতিশ্রুতিকে বেশ জোরের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছিল, যা নিয়ে তখন থেকেই তৃণমূল শিবিরের সঙ্গে সংঘাত হয়েছিল।

তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, বাংলায় কোনও অবস্থাতেই এই আইন কার্যকর হতে দেবেন না তিনি। তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, ইউসিসি মূলত দেশের বৈচিত্র্যপূর্ণ সামাজিক কাঠামো এবং ধর্মীয় বহুত্ববাদকে আঘাত করবে। ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার দাবিতে তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘকাল এই দেওয়ানি বিধির তীব্র বিরোধিতা করে সরব ছিল।

তবে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজ্যের ক্ষমতা এখন বিজেপির হাতে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ শুরু করে দেন। বিধানসভার প্রথম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনেই এই জটিল দেওয়ানি বিল নিয়ে আসা সরকারের সিদ্ধান্ত দলীয় অনড় আদর্শিক অবস্থানকেই পুনরায় স্পষ্ট করে দিল।

শুভেন্দু অধিকারীর সরকার এই বিল পাস করার পর এই রাজ্যের আপামর জনসাধারণের সামাজিক ও প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় ঠিক কী ধরনের মৌলিক পরিবর্তন আসতে চলেছে, তার একটি প্রাথমিক তুলনামূলক চিত্র নিচে উপস্থাপন করা হল।

বিষয় প্রচলিত ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন (পার্সোনাল ল) অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) চালুর পর বদল
Marriage (বিবাহের নিয়ম) ধর্মীয় রীতি ও পৃথক বিধান অনুযায়ী বিয়ের বয়স ও প্রথা নির্ধারিত হয়। ধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্য বিয়ের অভিন্ন ন্যূনতম বয়স ও আইনি বিধি থাকবে।
Divorce (বিবাহবিচ্ছেদ ও খোরপোশ) ধর্মীয় বোর্ডে বা পৃথক ব্যক্তিগত আইনে বিবাহবিচ্ছেদ ও ভরণপোষণের দাবি মেটানো হয়। আদালতের মাধ্যমে অভিন্ন আইনি উপায়ে বিচ্ছেদ ও সমান হারে খোরপোশ দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।
Inheritance (সম্পত্তির উত্তরাধিকার) কন্যা বা নারীদের সম্পত্তির অধিকারে ক্ষেত্রবিশেষে বৈষম্য বিদ্যমান। পুত্র ও কন্যার জন্য পৈতৃক সম্পত্তিতে সমান আইনি অধিকার সুনিশ্চিত হবে।
Adoption (দত্তক গ্রহণ ও লিভ-ইন) ধর্মভেদে সন্তান দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধা রয়েছে। লিভ-ইন নিয়ে স্পষ্ট আইন নেই। যে কোনও নাগরিকের দত্তক গ্রহণের সমানাধিকার থাকবে। লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নথিভুক্তি বাধ্যতামূলক হতে পারে।

আদিবাসী সমাজ ও বাংলায় প্রয়োগের চ্যালেঞ্জ

পশ্চিমবঙ্গের মতো বহুমাত্রিক রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সামাজিক বৈচিত্র্য রক্ষা করা। এই রাজ্যে একটি বিপুল আদিবাসী জনসংখ্যা রয়েছে, যাদের নিজস্ব সামাজিক নিয়মকানুন ও প্রথাগত সংস্কার দীর্ঘকাল ধরে আইনত স্বীকৃত। উত্তরাখণ্ডের আদলে তৈরি এই রাজ্যের খসড়া বিলে আদিবাসী সমাজকে ছাড় দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্য যেমন অসম বা উত্তরাখণ্ডে তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের নিজস্ব জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্যকে সুরক্ষিত রাখতে এই আইনের আওতা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। বাংলায় শুভেন্দু অধিকারীর সরকারও একই পথ অনুসরণ করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনীতিকরা। এর ফলে জঙ্গলমহল বা উত্তরবঙ্গের আদিবাসী সমাজের মনের আশঙ্কা ও সংশয় অনেকটাই কাটবে।

বিলটি বিধানসভায় পেশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে প্রবল আপত্তি আসার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। শাসক ও বিরোধী দলের দ্বন্দ্বে অধিবেশন কক্ষ উত্তপ্ত হতে পারে। বিলটি সরাসরি পাস করানো হবে, নাকি আলোচনার জন্য সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হবে, তার ওপরেই নির্ভর করছে অনেককিছু।

আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি এই নতুন ব্যবস্থার রূপায়ণও প্রশাসনের কাছে অন্যতম বড় পরীক্ষা হতে চলেছে। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের স্পর্শকাতর বিষয়গুলি বদলে যেতে থাকায় প্রতিটি স্তরে ব্যাপক প্রচার ও সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। সমস্ত রাজনৈতিক তরজা এড়িয়ে আগামী সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা এক অত্যন্ত ঐতিহাসিক মুহূর্তের মুখোমুখি হতে চলেছে, সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

Post Comment

You May Have Missed