Sheikh Hasina: শেখ হাসিনার পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ‘চর্চায়’ তারেকের সরকার! বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ
রাষ্ট্রসংঘের কাছে পাঠানো বার্তায় শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, আওয়ামি লিগকে নির্বাচনের বাইরে রেখে বাংলাদেশে যে ভোট হয়েছে, তাতে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়নি। তাঁর বক্তব্য, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না। আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ রাখার ফলে দলের সমর্থক ও ভোটারদের রাজনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
হাসিনার আরও অভিযোগ, আওয়ামি লিগের সমর্থকরা আদালতে গিয়ে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করতে চাইলেও তাঁদের উপর হামলার ঘটনা সেই পথ কঠিন করে তুলছে। তাঁর দাবি, এর ফলে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (ICCPR) চারটি ধারার লঙ্ঘন হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে রাষ্ট্রসংঘের তিন বিশেষজ্ঞের কাছে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আর্জি জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, বাংলাদেশে আওয়ামি লিগকে সামিল করে নতুন করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজনের দাবিও তুলেছেন।
বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা বারবার প্রকাশ্যে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। কয়েক মাস আগে এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি জানিয়েছিলেন, ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরতে চান। গত ৫ অগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পূর্তিকে সামনে রেখেও ডিসেম্বরে ফেরার কথা বলেছিলেন তিনি। এরপর ২০ অক্টোবর আমেরিকার একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আবারও বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন আওয়ামি লিগ নেত্রী।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বারবার দেশে ফেরার কথা বলে হাসিনা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এই বার্তা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন যে, তাঁর দেশত্যাগ সাময়িক এবং তিনি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর এই অবস্থান বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আওয়ামি লিগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবির সঙ্গে তাঁর দেশে ফেরার বার্তা যুক্ত হওয়ায় রাজনৈতিক চাপের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আওয়ামি লিগের উপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল, ক্ষমতায় এসে তা বহাল রেখেছে বিএনপি সরকার। ফলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে হাসিনার রাষ্ট্রসংঘের দ্বারস্থ হওয়া তারেক রহমানের সরকারের কাছে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, হাসিনার দেশে ফেরার বার্তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক শিবিরগুলির মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
হাসিনার বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামি লিগের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলের সমর্থকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনের আগে আওয়ামি লিগ ভোট বয়কটের ডাক দিয়েছিল এবং বাংলাদেশের ৪০ শতাংশেরও বেশি ভোটার ভোট দেননি। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে হাসিনা নিজের রাজনৈতিক প্রভাবের কথাও তুলে ধরছেন। যদিও ভোটদানের হার কম হওয়ার কারণকে সরাসরি কোনও একক দলের আহ্বানের ফল হিসেবে দেখার জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।
এ ছাড়া, হাসিনার দাবি অনুযায়ী, আওয়ামি লিগের কিছু ভোটার জামাতকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে বিএনপির প্রার্থীদের ভোট দিয়েছিলেন। এই দাবি সত্য হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে ভোটের কৌশলগত স্থানান্তরের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে আওয়ামি লিগের ভোটারদের কতটা অংশ এভাবে ভোট দিয়েছেন, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ছাড়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যায় না।
এখন প্রশ্ন, ভবিষ্যতে আওয়ামি লিগকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে? হাসিনা মনে করছেন, দলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নতুন করে ভোট হলে আওয়ামি লিগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা নির্ভর করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনী পরিবেশ এবং ভোটারদের মনোভাবের উপর।
হাসিনার রাষ্ট্রসংঘের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনা আরও একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত তৎপরতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্যও দিয়েছিলেন।
হাসিনার সমালোচকদের বক্তব্য, তাঁর সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ, হিন্দুদের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন হিংসাত্মক ঘটনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দীপু দাসকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ-সহ বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্তের ফল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং রাষ্ট্রসংঘের নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এই প্রেক্ষাপটে হাসিনার রাষ্ট্রসংঘের কাছে আবেদনকে অনেকে আন্তর্জাতিক মহলের উপর চাপ তৈরির একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। তাঁর যুক্তি, যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির ভিত্তিতে অতীতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, সেই নীতির আলোতেই বর্তমান সরকারের আমলে আওয়ামি লিগের নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক অধিকার খর্বের অভিযোগ বিচার করা উচিত।
রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার আরেকটি দিক হল, বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির প্রতিক্রিয়া কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, হিংসা এবং রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগের তুলনায় কিছু অন্য ঘটনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহলের তৎপরতা বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।
দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র বিক্ষোভকারীদের আটক করার ঘটনাও এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন ঘটনার প্রকৃতি, আইনি প্রেক্ষাপট এবং রাষ্ট্রসংঘের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এক নয়। তাই কেবল দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়ার তুলনা করে রাষ্ট্রসংঘের পক্ষপাতের সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সংশ্লিষ্ট নথি ও বক্তব্য খতিয়ে দেখা জরুরি।
হাসিনার রাষ্ট্রসংঘের কাছে আবেদনকে এই বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তাঁর অবস্থান, বাংলাদেশে আওয়ামি লিগের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং দলের সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাটিকে এবার সরাসরি অবস্থান নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, আওয়ামি লিগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নতুন করে নির্বাচন এবং দেশে ফেরার দাবি—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন শেখ হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামি লিগকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ফলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দলের সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
রাষ্ট্রসংঘের তিন বিশেষজ্ঞের কাছে জরুরি পদক্ষেপের আবেদন জানিয়ে হাসিনা কার্যত তারেক রহমানের সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছেন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
Post Comment