হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড! ন্যাপথা পাইপলাইনে বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ অনেকে, শিল্পাঞ্চলে আতঙ্ক
West Bengal
-Ritesh Ghosh
পূর্ব মেদিনীপুরের শিল্পনগরী হলদিয়ায় অবস্থিত হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের কারখানায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার ভোরে কারখানার একটি গুরুত্বপূর্ণ ন্যাপথা পাইপলাইনে আচমকা বিস্ফোরণ ঘটে এবং তার পরেই দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করে। এই বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের জেরে কারখানার ভিতরে ও সংলগ্ন এলাকায় কর্মরত অন্তত ২০ জন মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। তার মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দমকলের একাধিক ইঞ্জিন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করে।
দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই মারাত্মক ছিল যে, লেলিহান আগুনের শিখা অনেক দূর থেকে দৃশ্যমান হয়। স্থানীয় কারখানা কর্মী এবং দমকলের প্রাথমিক অনুমান থেকে জানা গিয়েছে, আহতদের মধ্যে অন্তত পাঁচজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তাঁদের দেহের অধিকাংশ অংশই পুড়ে গিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকারীদের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে আহতদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা সম্ভব হয়েছে। কয়েকজনকে কলকাতায় রেফার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার ভোর রাত থেকেই হলদিয়া ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রবল বজ্রবিদ্যুৎ-সহ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। ঠিক সেই সময় আচমকাই হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালের ন্যাপথা পাইপলাইনটি ফেটে যায় এবং সেখান থেকে অতি দাহ্য তরল রাসায়নিক ন্যাপথা চারদিকে লিক করতে থাকে। রাসায়নিক লিক হওয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে গোটা পাইপলাইনে আগুন ধরে যায়। আগুনের করাল গ্রাস এতটাই তীব্র ছিল যে কারখানার সীমানা ছাড়িয়ে আশপাশের বেশ কয়েকটি কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি পুড়ে গিয়েছে।
হঠাৎ এই বিপর্যয়ে কারখানার ভিতরে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। প্রত্যন্ত এলাকা এবং খারাপ আবহাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের পক্ষে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ামাত্রই বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং দমকলের একাধিক ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। দমকলের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হওয়া সমস্ত আক্রান্তকে তড়িঘড়ি হলদিয়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রাথমিক চিকিৎসার কাজ শুরু করেন। তবে আশঙ্কাজনক ৫ জনসহ বেশ কয়েকজনের শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হওয়ায় তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
কী কারণে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটল, তা সঠিকভাবে জানতে ইতিমধ্যেই বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত তদন্ত দল কাজ শুরু করেছে। দমকল বাহিনীর প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, প্রবল বৃষ্টির সময় কারখানার পাইপলাইনের ওপর কোনও শক্তিশালী বজ্রাঘাত ঘটেছিল। এই বজ্রবিদ্যুতের ফলেই অতি দাহ্য ন্যাপথা গ্যাসে আগুন ধরে গিয়ে পাইপলাইনটি ফেটে থাকতে পারে। তবে কারখানার নিরাপত্তা পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এই কাণ্ড ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ এবং কারখানা কর্তৃপক্ষ পৃথক তদন্ত শুরু করেছে।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করতে এদিন সকালেই ঘটনাস্থলে পৌঁছন হলদিয়ার বিধায়ক তাপসী মণ্ডল। তিনি কারখানার আক্রান্ত ইউনিট এবং আশেপাশের ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়িগুলো ঘুরে দেখেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং আহত শ্রমিকদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে বিধায়ক জানান যে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহতদের সুচিকিৎসা সুনিশ্চিত করতে সমস্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়েও জেলা শাসকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের পক্ষ থেকে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে জানানো হয়েছে, এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির গভীরতা এবং কারণ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে কারখানার কর্মী ও আশেপাশের নাগরিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করাই প্রাথমিক লক্ষ্য।



Post Comment