অগাস্টেই বিধানসভায় আসছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি! সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে তৈরি হবে নতুন খসড়া

অগাস্টেই বিধানসভায় আসছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি! সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে তৈরি হবে নতুন খসড়া

West Bengal

-Ritesh Ghosh

পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) চালুর রূপরেখা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এবার সরকারি স্তরে গতি পেতে চলেছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগতভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, আগামী অগাস্ট মাসেই বিধানসভায় পেশ হতে চলেছে বহুচর্চিত এই সংক্রান্ত বিলটি। সব ঠিক থাকলে প্রস্তাবিত এই নতুন আইনটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর তা রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে লাগু করার পথে এগোবে।

বিধানসভায় সোমবার তিনটি বিল পেশ করার পরে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, দেশের সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদের ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই বিলটি খসড়া করা হচ্ছে। এই খসড়া তৈরি করতে রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে, যা সামগ্রিক সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবে।

West Bengal Assembly Uniform Civil Code bill announcement

দেশের বেশ কয়েকটি বিজেপি শাসিত রাজ্যের মতোই এবার পশ্চিমবঙ্গও একই পথে হাঁটতে চলেছে। মুখ্যমন্ত্রী সুনির্দিষ্টভাবে জানান, গুজরাত, উত্তরাখণ্ড এবং অসম ইতিমধ্যেই এই আইন আনার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ তাদের পথ অনুসরণ করেই কাজ করবে। এর ফলে সব সম্প্রদায়ের জন্য একটিই অভিন্ন দেওয়ানি বিধান লাগু হবে এবং ধর্মীয় ভেদাভেদ দূর হবে।

সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ২ জুলাই মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই খসড়া বিলটি পেশ করা হবে সরকারি অনুমোদনের জন্য। মন্ত্রিসভার সায় পাওয়ার পরই পুরো প্রশাসনিক স্তরে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে। সেই পর্ব মিটলেই অগাস্টের গোড়াতে বসতে চলা বিধানসভার বাদল অধিবেশনে বিলটি পেশ করে আইনি সিলমোহর দেওয়ার ব্যবস্থা করবে সরকার।

এই বিলটি কেবল রাজনৈতিক স্তরে পাস করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না নবান্ন। বিষয়টির সংবেদনশীলতা মাথায় রেখে এর গভীরতা এবং প্রতিটি ধারাকে আইনি চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই কারণেই একটি সর্বগ্রাহী ও ভারসাম্যপূর্ণ খসড়া তৈরি করতে একাধিক বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে কোনও আইনি ফাঁকফোকর না থাকে।

প্রস্তাবিত বিলের রূপরেখা ও নীতি নির্ধারণের জন্য যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হবে, তার প্রধানের দায়িত্বে থাকবেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা প্রসাদ দেশাই। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে দীর্ঘদিন বিচারকাজ সামলানোর কারণে বৈচিত্র্যময় এই সমাজব্যবস্থার আইনি খুঁটিনাটি তাঁর নখদর্পণে। তাঁর নিরপেক্ষ নেতৃত্ব এই বিলে সাংবিধানিক ভারসাম্য ও সাধারণ নাগরিকদের স্বস্তি বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

এই পাঁচ সদস্যের বিশেষ কমিটিতে শুধুমাত্র আইনি জগতের মানুষই থাকছেন না, বরং সমাজের নানান ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে। কমিটির অন্য সদস্যদের তালিকায় রাখা হচ্ছে একজন কৃতী অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার, লব্ধপ্রতিষ্ঠ শিক্ষাবিদ, স্বনামধন্য সমাজকর্মী, প্রথিতযশা আইনজ্ঞ এবং প্রশাসনিক কাজে দক্ষ অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের একজন উচ্চপদস্থ আমলাকে। এই সংমিশ্রণ খসড়াটিকে আরও নিখুঁত করে তুলবে।

কমিটিকে মূলত পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত আইনের ক্ষেত্রে অন্তত নয়টি বড়সড় বিষয়ের উপর দীর্ঘ গবেষণা চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের মতামত সংগ্রহ করা হবে। দলমত নির্বিশেষে সকলের উদ্বেগ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুভূতিকে যাচাই করার পরই কমিটি তাদের চূড়ান্ত খসড়া রিপোর্টটি সরকারের বিবেচনার জন্য পাঠাবে।

রঞ্জনা দেশাইয়ের নেতৃত্বাধীন কমিটি যাতে সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়, তার জন্য প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে। সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়ার সময় যাতে কোনও বিভ্রান্তি না ছড়ায়, সে ব্যাপারেও প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটি প্রতিটি মতামত নথিভুক্ত করে সেগুলির আইনি যুক্তি খতিয়ে দেখে তবেই সেগুলিকে চূড়ান্ত খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করবে।

পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি লাগু হওয়ার পর সাধারণ মানুষের পারিবারিক বিরোধ মেটানোর পরিধি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হতে চলেছে। মূলত চারটে বড় দেওয়ানি বিষয়ের উপর এই আইন দারুণ প্রভাব ফেলবে। প্রথমত বিয়ে ও বিবাহের বয়সসীমা, দ্বিতীয়ত বিবাহবিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া, তৃতীয়ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং চতুর্থত পরিবারের সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তির সুষম বণ্টন। এগুলি সবই নতুন আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ধর্মের জন্য বিয়ের বিধি বা দত্তক নেওয়ার নিয়মে পৃথক ধর্মীয় আইন সক্রিয় রয়েছে। প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু হলে এই সমস্ত প্রাচীন পার্সোনাল ল’ বা ব্যক্তিগত ধর্মীয় আইন তামাদি হয়ে যাবে। এর জায়গায় আসবে সবার জন্য এক দেশ, এক বিধানের নতুন ধর্মনিরপেক্ষ আইনি রূপরেখা, যা দেশের বিচার ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করবে।

ইসলামী শরিয়ত বোর্ডের দেওয়ানি আইনের ধারাগুলিও এই আইন কার্যকরের পর এ রাজ্যে আইনি বৈধতা হারাবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বড় স্বস্তির খবর দেওয়া হয়েছে আদিবাসী ও প্রাচীন সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য। মুখ্যমন্ত্রী এদিন বিধানসভায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এ রাজ্যের আদিবাসী ও জনজাতি গোষ্ঠীগুলিকে এই নতুন আইনের আওতা থেকে পুরোপুরি বাইরে রাখা হবে।

আদিবাসী সমাজের নিজস্ব উৎসব, প্রথা, সংস্কৃতি এবং বিয়ের নিজস্ব সামাজিক নিয়মনীতি বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত। আদিবাসীদের নিজস্ব জীবনযাত্রায় যাতে কোনও ক্ষতের সৃষ্টি না হয়, তার জন্য প্রশাসন এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে আদিবাসীদের নিজস্ব সামাজিক ও পারিবারিক আইনি প্রথা পূর্বের মতোই স্বাভাবিকভাবে রাজ্য জুড়ে আইনগত উপায়ে বলবৎ থাকবে।

এই ঐতিহাসিক ঘোষণার পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভার ভেতরে বসেই সাধারণ মানুষের প্রতি একটি বিশেষ আবেদন রেখেছেন। তিনি বলেন, বিলটি নিয়ে যদি নাগরিক সমাজ বা বিরোধী দলগুলির কোনও পরামর্শ বা অভিযোগ থাকে, তবে তাঁরা যেন সরাসরি বিচারপতি রঞ্জনা দেশাইয়ের কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রশাসনের লক্ষ্য হল সর্বসম্মত উপায়ে নিজের সংকল্প বাস্তবায়ন করা।

Post Comment

You May Have Missed