১ জুলাই থেকে পেট্রোল-ডিজেল নিয়ে বড় সুখবর, উঠে যাচ্ছে সব বিধিনিষেধ!

১ জুলাই থেকে পেট্রোল-ডিজেল নিয়ে বড় সুখবর, উঠে যাচ্ছে সব বিধিনিষেধ!

Business

-Ritesh Ghosh

দেশে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বড়সড় স্বস্তির খবর। আগামী ১ জুলাই থেকে পেট্রোল ও ডিজেল বিক্রির উপর চাপানো সমস্ত সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিতে চলেছে কেন্দ্র সরকার। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েন এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় চলতি মাসের শুরুতে এই জরুরি পদক্ষেপ করা হয়েছিল। সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ক্ষেত্র—সব মহলেরই বড় উদ্বেগ দূর হতে চলেছে।

চলতি জুন মাসের গোড়ার দিকে দেশে যখন আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তখন সাধারণ গ্রাহকদের জন্য জ্বালানি সুরক্ষিত করাই ছিল সরকারের মূল লক্ষ্য। সেই সময়ে বড় বাণিজ্যিক ক্রেতাদের খুচরো পাম্প থেকে জ্বালানি সংগ্রহ বন্ধ করা হয়েছিল। হঠাৎ করে তৈরি হওয়া এই নিয়মে বাজারে সাময়িক বিভ্রান্তি ছড়ালেও, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে।

Fuel station signs indicating normal petrol and diesel sales

মূলত ইরান এবং মার্কিন-ইজরায়েল সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এই মহাসমুদ্র পথটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জ্বালানি রুট, যেখান দিয়ে দৈনিক কোটি কোটি ব্যারেল অশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। এই এলাকা অবরুদ্ধ হলে ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশে যাতে তেলের কোনও ঘাটতি না দেখা দেয়, সেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবেই সাময়িক বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিল।

ভারতের প্রায় ৮৫ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে আসে। তাই হরমুজ প্রণালীর সঙ্কট সরাসরি এদেশের বাজারে জোরালো আঘাত হানতে পারত। ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলি যাতে আপৎকালীন সময়ের জন্য পর্যাপ্ত মজুত বজায় রাখতে পারে, সেই কৌশলগত পরিকল্পনাও এই কড়াকড়ির সাথে যুক্ত ছিল। পরিস্থিতি পুনরায় থিতু হওয়ায় সেই কঠিন দিনগুলির অবসান ঘটতে চলেছে।

ঘোষিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, পাম্পগুলি থেকে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের পেট্রোল ও ডিজেল কেনার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা পুরোপুরি উঠে যাচ্ছে। এছাড়া খুচরো বাজারে ডিজেল বিক্রির ক্ষেত্রে দৈনিক যে লিটারভিত্তিক বা আর্থিক ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তাও বাতিল হচ্ছে। এর ফলে পরিবহণ ক্ষেত্র এবং মাঝারি ও ভারী শিল্পে তেলের জোগান আবার আগের মতো স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে আসবে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের লজিস্টিকস এবং পণ্য পরিবহণ ক্ষেত্রে বড় স্বস্তি মিলবে। গত কয়েক সপ্তাহে দূরপাল্লার পণ্যবাহী ট্রাকগুলির জ্বালানির ক্ষেত্রে কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, ১ জুলাই থেকে জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন হলে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহণ খরচ কমবে, যা খুচরো বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখাও অনেকখানি সহজ করবে।

পেট্রোল ও ডিজেলের পাশাপাশি বাণিজ্যিক এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের ক্ষেত্রেও বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক। গত সপ্তাহেই অসংরক্ষিত এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য রান্নার গ্যাসের জোগান প্রাক-সংকট সীমার কাছাকাছি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। গত মার্চ মাসে যুদ্ধ পরিস্থিতির জের ধরে গৃহস্থালির গ্যাসের জোগান অক্ষুণ্ণ রাখতে বাণিজ্যিক ব্যবহারে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছিল।

পূর্ববর্তী বিধিনিষেধের কারণে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের বরাদ্দ ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় হোটেল, রেস্তোরাঁ, বেকারি এবং অন্যান্য একাধিক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প চরম বিপাকে পড়েছিল। বিকল্প হিসেবে বাধ্য হয়ে অনেকেই ডিজেল বা পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর কয়লা ব্যবহার শুরু করেছিলেন। সরকারের নতুন পদক্ষেপে এই ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলি তাদের চিরাচরিত গ্যাস ব্যবস্থায় ফিরতে পারবে।

নতুন সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, তৈল বিপণন সংস্থাগুলিকে অবিলম্বে শতভাগ বাণিজ্যিক সিলিন্ডার সরবরাহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বাল্ক বা বড় আকারের এলপিজি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শিথিল করা হয়েছে। এর ফলে যেসব বড় প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট সম্পূর্ণভাবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তারা উৎপাদন ঘাটতি মিটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। কয়লা এবং অতিরিক্ত মূল্যের ডিজেল ব্যবহারের কারণে হোটেল বা রেস্তোরাঁর খাবার তৈরির খরচ এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। গ্যাসের জোগান স্বাভাবিক হওয়ার ফলে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রটি আবার স্থিতিশীল হবে এবং সামগ্রিকভাবে ব্যবসায়িক কার্যকলাপে আগের গতি ফিরে আসবে।

এলপিজি সরবরাহে ছাড় দিলেও কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে একটি নির্দিষ্ট নীতিগত বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। সংকটের দিনগুলিতে যেসব বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহক পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস বা পিএনজি সংযোগ গ্রহণ করেছিলেন, তারা আর এলপিজিতে ফিরে যেতে পারবেন না। বায়ুদূষণ রোধ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের ধারা দেশজুড়ে বজায় রাখতেই সরকারের এই অনড় নীতি।

আসলে ভারতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি পরিকাঠামো গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরেই পিএনজি বা সিএনজি ব্যবহারের ওপরে জোর দিচ্ছে তেল মন্ত্রক। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারে প্রাকৃতিক গ্যাসের অবদান ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সংকটের সময়ে পিএনজিতে স্থানান্তরিত হওয়া গ্রাহকদের আবার এলপিজিতে ফিরতে দিলে সরকারের সেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খেত।

প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা মনে করছেন, এই জোরপূর্বক রূপান্তর ভারতীয় শিল্পের জন্য আখেরে লাভজনকই হবে। কারণ এলপিজির তুলনায় পাইপলাইনের গ্যাস অনেক বেশি নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী। তাই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি বলয়ের মধ্যেই ধরে রাখতে এই রূপান্তরকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যা দেশের সামগ্রিক ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতির সঙ্গেও সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।

ভারতের মতো বিশাল বাজারে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা যে কোনো সময়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এবারের সংকটে সরকার যেভাবে আপৎকালীন মজুত ব্যবহার করেছে এবং বণ্টন ব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রেখেছে, তা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছে। এটি প্রমাণ করে যে ভূ-রাজনীতির বিপর্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে ভারত এখন অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ।

সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি সচল রাখতে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম এবং জোগানের দিকে প্রতিনিয়ত কড়া নজর রাখছে নতুন দিল্লি। ১ জুলাই থেকে জ্বালানি বিক্রির সমস্ত বাধা দূর হওয়ায় দেশের শিল্প ও বাণিজ্য মহল ব্যাপক স্বস্তির শ্বাস ফেলছে। তবে ভবিষ্যতে যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক আকস্মিকতা মোকাবিলায় তেল মন্ত্রক অভ্যন্তরীণ বিকল্প ক্ষেত্রগুলির বিকাশ আরও দ্রুত করতে বদ্ধপরিকর।

Post Comment

You May Have Missed