‘নতুন প্রজন্ম বাংলায় কাজ না পেয়ে, মুম্বই চলে যাচ্ছে! টলিউড আর কবে বুঝবে?’, প্রশ্ন চৈতি ঘোষালের?
তোর্ষা ভট্টাচার্য্য, কলকাতা: ছোটপর্দা থেকে বড়পর্দা.. এমনকি মঞ্চ.. বিনোদনের প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই সাবলীল যাতায়াত তাঁর। তবে এবার, একেবারে নতুন ইনিংস, পরিচালকের জুতোয় পা গলাচ্ছেন চৈতি ঘোষাল (Chaiti Ghoshal)। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, অপেক্ষা, অভিজ্ঞতা, খাটনি… সমস্ত কিছুর পরে, মুক্তি পাচ্ছে, তাঁর প্রথম সিনেমা, ‘নেভার মাইন্ড’ (Never Mind)। মুখ্যভূমিকায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত (Rituparna Sengupta) এবং চৈতি পুত্র, অর্মত্য রায়। প্রথম পরিচালনার কাজ থেকে শুরু করে, ছেলেকে পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা, টলিউডের পরিস্থিতি… সমস্ত বিষয় নিয়েই খোলামেলা আলোচনা করলেন, চৈতি ঘোষাল।
দীর্ঘ পরিচালনার অভিজ্ঞতা, কেন হঠাৎ পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত?
অভিনয় করেছেন দীর্ঘদিন, পরিচালনার গুরুদায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিছনে, চৈতির কোন ভাবনা কাজ করেছে? অভিনেত্রী-পরিচালক বলছেন, ‘অভিনয়টা আমার ছোটবেলার সখ, পরিচালনায় আসার সিদ্ধান্তটা আবেগের বলতে পারেন। কখনও ভাবিনি ছবি পরিচালনা করব, কিন্তু যখন যে ছবিতেই কাজ করেছি, পরিচালককে নিজের মতামত, ভাবনা জানিয়েছি। পরিচালক সেগুলো গ্রহণ ও করেছেন। এভাবেই কাজ করে আমি অভ্যস্থ। ‘নেভার মাইন্ড’ ছবির গল্পটা আমায় ভীষণ ছুঁয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, এই গল্পটা বলা প্রয়োজন। আর সেই সময়েই মনে হয়েছিল, এত বছরের অভিনয়, অভিজ্ঞতা.. সব মিলিয়ে এবার ছবি পরিচালনার জন্য ও আমি প্রস্তুত। আমাদের পরিবারে ছবি পরিচালনার ইতিহাস তো রয়েছেই। আমার স্বামী পরিচালনার কাজ করেছেন, ছেলের পড়াশোনাও পরিচালনা নিয়েই। অর্মত্য এই ছবির সহকারী পরিচালকও। পাশাপাশি এই ছবির যাঁরা কলাকুশলী, ক্যামেরা পার্সন থেকে শুরু করে, রূপম ইসলাম (Rupam Islam), বাকি অভিনেতা, অভিনেত্রীরা.. প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলেই মনে হয়েছিল, তাঁদের আমার ভাবনাটা পছন্দ হয়েছে। সেটাই আমায় আরও সাহস জুগিয়েছে।’
ঋতুপর্ণা এবং অমর্ত্যকেই মুখভূমিকায় কেন সুযোগ?
ছবির মুখ ঋতুপর্ণা এবং অর্মত্য, কাস্টিংয়ের এই সিদ্ধান্ত কী ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই? চৈতির সাফ জবাব, ‘একেবারেই নয়। গল্পের জন্য আমার এমন একজন মহিলা চরিত্রের দরকার ছিল, যিনি ৪০ উর্ধ্ব। বিদেশে একা জীবনযাপন করেছেন। তাঁর চালচলন কথাবার্তায় একটা ঝকঝকে আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়বে। আর অন্যদিকে সে হবে ভীষণ রুচিশীল এবং বাঙালিয়ানায় ভরা। এই বৈশিষ্ট্যগুলো চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলেই, আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল ঋতুর কথা। ও ছিল প্রথম পছন্দ। তবে ওর কাছে আমি ছবি প্রযোজনা করার কথা বলতে যাইনি। ওকে শুধু অভিনেত্রী হিসেবেই চেয়েছিলাম। প্রযোজনার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় ঋতুই। তবে একটা কথা বলব, প্রযোজক ঋতু আমার স্বপ্নগুলোকে, আমার শিল্পসত্ত্বাকে ডানা মেলে ওড়ার সুযোগ দিয়েছে। আমি কৃতজ্ঞ এর জন্য।’
একটু থেমে চৈতি ফের বলেন, ‘অমর্ত্য যে চরিত্রটায় অভিনয় করছে, সেটা একজন মিউজিসিয়নের। ও তো সত্যিই একজন মিউজিসিয়ানই। পাবে গিয়ে গিটার বাজিয়ে গান গেয়েছে, চুটিয়ে কনসার্ট করেছে। ওর লম্বা চুল থেকে শুরু করে উচ্চতা… সবটাই আমার জুড চরিত্রটার জন্য় পারফেক্ট বলে মনে হয়েছিল। তবে এই সবকিছুর বাইরে আমার যেটা দরকার ছিল, সেটা হল একটা সারল্যমাখা চোখ। সেটা আমি পেয়েছিলাম অমর্ত্যর মধ্যে। রূপমের গিটারের সঙ্গে পর্দায় গিটার বাজাতে গেলে, তাঁকে তো নিজেকেও গিটারটা জানতে হবে। সেই কারণেই অমর্ত্য। আর অমর্ত্য আমার ছেলে বলে আর আমি ও মা বলে যে, সবসময় একে অপরের প্রশংসা করি, এটা একেবারেই নয়। আমরা একে অপরের সবচেয়ে বড় ক্রিটিক।’
টলিউডে নতুন প্রজন্ম কি কাজ পাচ্ছে না?
প্রথম নয়, বাংলা থেকে শুরু করে বলিউড একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন অমর্ত্য, প্রশংসাও পেয়েছেন। তাহলে টলিউডে চৈতি পুত্রের ছবির সংখ্যা এত কম কেন? অমর্ত্যর আরও বেশি সুযোগ পাওয়া উচিত বলে মনে করেন? প্রশ্ন শুনে, চৈতির গলায় সামান্য হতাশা। একটু থেমে বললেন, ‘আমি মনে করি, উচিত। কিন্তু টলিউড কি সেটা মনে করছে? এখন ইন্ডাস্ট্রিতে ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে নায়ক নায়িকাদের সংখ্যা কত বলুন তো? এই বয়সের ছেলেমেয়েরা ছবির মুখ হয়ে ওঠার যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছে কি? যদি পায়, তাহলে তাঁদের শহরের বাইরে গিয়ে থাকতে হচ্ছে কেন? মা হিসেবে আমি তো চাই, অমর্ত্য কলকাতাতেই থাকুক। এখান থেকে মুম্বইতে যাতায়াত করে কাজ করুক, কিন্তু তার ঠিক উল্টোটা হচ্ছে। শুধু অমর্ত্য কেন বলব? ঋদ্ধির (ঋদ্ধি সেন) মতো দুর্দান্ত অভিনেতাকে ক’টা বাংলা ছবির মুখ করা হয়েছে? থিয়েটারের মঞ্চের মতো নিয়মিত ওকে পর্দায় পাওয়া যাচ্ছে না কেন? শান্তিদার (শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়) ছেলে ঋতর (ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়) হাতে নিয়মিত কাজ কোথায়? উজান (উজান গঙ্গোপাধ্যায়) পরিচালনা করছে… কত বলব? টলিউড যদি নতুন প্রজন্মের নায়ক নায়িকা তৈরি করার কথা না ভাবে, তাতে আখেরে বাংলারই ক্ষতি। একটা গোটা প্রজন্ম বাংলার বাইরে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ভুলে গেলে চলবে না, নতুন নায়ক নায়িকা না আসলে, নতুন দর্শক ও তো তৈরি হবে না। তবে নতুন অভিনেতা তৈরির মাপকাঠি রিলস আর পাপারাৎজি হলে, তার থেকে হতাশার আর কিছু নেই। যে ছেলেটি পড়াশোনা করেছে, কাজ নিয়ে মগ্ন থাকতে ভালবাসে… সে কাজ পাবে না শুধু রিল করে না বলে? পরিচালকেরা এই পন্থায় নায়ক নায়িকা বাছাই করলে, তার ফল যে কি হবে, কল্পনা করা যায় না। পরিচালক হিসেবে, অভিনেতা হিসেবেও, আমি মেধা আর শিক্ষায় বিশ্বাস করি।’
Jisshu Sengupta: যাদের যাদের যা যা বলার, ভালো-মন্দ বা অভিমানের কথা, বলে ফেলা খুব জরুরি



Post Comment