স্নানযাত্রায় জগন্নাথের অলৌকিক স্নান ও গজবেশ, কেন ১৫ দিন থাকেন লোকচক্ষুর আড়ালে?

স্নানযাত্রায় জগন্নাথের অলৌকিক স্নান ও গজবেশ, কেন ১৫ দিন থাকেন লোকচক্ষুর আড়ালে?

India

-Ritesh Ghosh

স্নানযাত্রার পুণ্যলগ্নে ভক্তিরসে আপ্লুত ওড়িশার শ্রীক্ষেত্র পুরী ধাম। কঠোর নিরাপত্তা ও ভক্তিভাবের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে মহাপ্রভু জগন্নাথ, বড়ভাই বলভদ্র এবং দেবী সুভদ্রার জলযাত্রা বা স্নান পূর্ণিমার বৈদিক প্রথা। এই শুভ উৎসবটি আসলে শ্রীক্ষেত্র পুরীর রথযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়।

প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে তিন দেবদেবী মন্দিরের রত্নবেদী থেকে বাইরে এসে স্নান মণ্ডপে অধিষ্ঠান করেন। এই বিরল দর্শনের আকর্ষণে লক্ষ লক্ষ দেশি-বিদেশি পুণ্যার্থীর ঢল নেমেছে সমুদ্রতীরে। আসলে বছরের এই একটি মাত্র দিনেই মন্দিরের সাধারণ ভক্তরা ভগবান জগন্নাথদেবকে নিজের চোখে স্নান করতে দেখার পরম সৌভাগ্য লাভ করে থাকেন, যা ভক্তিসাধনায় অত্যন্ত দুর্লভ।

Devotees witnessing the Lord Jagannath Snana Yatra in Puri

সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতিতে স্নান পূর্ণিমা কেবল কোনও সাধারণ পুজো বা পার্বণ নয়। এটি মূলত আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক নবীকরণ এবং বর্ষব্যাপী ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির এক গভীর ঐতিহাসিক মেলবন্ধন। মনে করা হয়, এই মহামঙ্গলময় স্নান উৎসবের মাধুর্যের মধ্য দিয়েই মূলত মহাপ্রভু তাঁর প্রিয় মানব সমাজকে প্রকৃতির পরিবর্তন এবং সুস্থ ও সুরক্ষিত জীবনযাত্রার বার্তা পৌঁছে দেন।

স্নানযাত্রার মূল আকর্ষণ হল মহাপ্রভু দেবত্রয়ীর এই মহাস্নান পর্ব। শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে এদিন মন্দিরের শুভ উত্তর দিকে অবস্থিত সুবর্ণ কূপ বা ‘সোনা কুয়া’ থেকে বিশেষভাবে ১০৮ ঘড়া পবিত্র জল তোলা হয়। এই জল বছরের অন্যান্য সময়ে ব্যবহারের নিয়ম নেই। কেবল স্নানযাত্রার পুণ্য লগ্নেই এই জল তুলে দেবতাদের স্নানের কাজে নিয়োজিত করেন শ্রীমন্দিরের নির্দিষ্ট সেবকরা।

জল সংগ্রহের পর তাতে কর্পূর, খাঁটি চন্দন কাঠ গুঁড়ো, অত্যন্ত সুগন্ধী মরশুমি ফুল এবং কস্তুরীর মতো একাধিক ভেষজ সামগ্রী মেশানো হয়। এই আয়ুর্বেদিক ঔষধিসমৃদ্ধ জল দিয়েই মন্ত্রোচ্চারণের মাঝে তিন দেবদেবীকে স্নান করানো সম্পন্ন হয়। তীব্র গরমের পর দেবতাদের দেহে এই ভেষজ জল যেমন শান্তি এনে দেয়, তেমনই তা প্রাকৃতিক নিরাময়ের চিকিৎসাকেও গভীরভাবে প্রতীকায়িত করে।

পুরী মন্দিরের প্রবীণ পূজারিদের মতে, পুরোহিতদের সুনিপুণ মন্ত্রোচ্চারণ এবং সুবর্ণ কূপের জল মিলে এই স্নান উৎসব এক অলৌকিক পরিবেশ তৈরি করে। গোটা স্নান মণ্ডপ ভক্তিগীত আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। এই সময় চতুষ্পার্শ্বের শ্মশান ও আধ্যাত্মিক পরিবেশও এক নতুন চৈতন্যে রূপান্তরিত হয়। দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ ভক্তের মুখে জয় জগন্নাথ ধ্বনিতে পুরীধাম কেঁপে ওঠে।

মহাস্নানের পবিত্র আচারটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ার পরই শুরু হয় শ্রীজগন্নাথ দেবের অপরূপ সাজে সাজার প্রক্রিয়া। সাধারণ মানুষের কাছে এই সাজ ‘হাতি বেশ’ বা গজবেশ রূপে অত্যন্ত সুপরিচিত। স্নানবেদীতেই মূল সাজসজ্জা শেষ করে তিন দেবদেবীকে সাক্ষাৎ গজানন বা বিঘ্নহর্তা গণেশের আকৃতি দেওয়া হয়। ভক্তরা এই দৃশ্য দেখে জীবন সার্থক মনে করেন এবং ভক্তিভরে প্রণাম জানান।

বিশ্বাস করা হয় যে, গণেশ ও জগন্নাথের এই যুগল মিলন মানুষের মনের সমস্ত অমঙ্গল ও পাপ হরণ করতে সমর্থ। বহু ঐতিহাসিক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, অতীতে এক গোঁড়া গণেশ উপাসক জগন্নাথকে সাধারণ হরি ভেবে অবহেলা করেছিলেন। তাঁর ভ্রান্তি দূর করতে এবং সমস্ত দেবতাই যে আদতে এক, সেই পরম সত্য প্রচার করতেই শ্রীজগন্নাথদেব নিজেকে গণেশ সাজে সাজিয়েছিলেন।

তবে স্নানের আনন্দ বিদায় নেওয়ার পরই শ্রীক্ষেত্রে শুরু হয় এক বেদনাবিধুর ও রহস্যময় অনুশাসন। এটিকে সনাতন ধর্মীয় ভাষায় ‘অনসর’ বা অনবসর কাল বলা হয়ে থাকে। প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুসারে, দীর্ঘ সময় সুবর্ণ কূপের ঠাণ্ডা জলে স্নান করার ফলে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাঁদের শরীরে তীব্র জ্বর দেখা দেয়।

এই অসুস্থতার কারণে আগামী ১৫ দিন মন্দিরের প্রধান গর্ভগৃহ ভক্তদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। শ্রীবিগ্রহের পুজোও এই সময়ে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। এই নিভৃতবাস বা কোয়ারেন্টাইন পর্বে দেবতাদের অত্যন্ত সর্তকতার সাথে রাজবৈদ্যের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। মন্দিরের চার দেওয়ালের ভেতরে কেবলমাত্র প্রধান সেবক বা দৈতাপতিরাই মহাপ্রভুদের ঘরে প্রবেশ করতে এবং তাদের সেবা করতে পারেন।

অনবসরের এই দিনগুলোতে দেবতাদের খুব সহজপাচ্য খাবার যেমন ফলের রস, শুকনো মিষ্টি এবং বিশেষ ভেষজ কাড়া বা পাঁচন সেবন করানো হয়। শ্রীবিগ্রহের গায়ে মালিশ করা হয় বিশেষ ভেষজ তৈল বা ‘ফুলুরি তেল’। অন্যদিকে, গর্ভগৃহে দেবতার অনুপস্থিতিতে ভক্তরা মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেন না ঠিকই, তবে তাঁরা বাইরে টাঙানো ঈশ্বরের বিশেষ পটচিত্র দেখে উপাসনা চালান।

দীর্ঘ ১৫ দিনের চিকিৎসা চলার পর অবশেষে নিভৃতবাসের অবসান ঘটে নবযৌবন বা নেত্রোৎসবের তিথিতে। দেবতাদের চোখের রোগ নিরাময় হওয়ার রূপ দেখার জন্য ভক্তরা আবার উন্মুখ হয়ে ওঠেন। সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে জগন্নাথদেব নতুন জীবনের শক্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন। এরপরই ভক্তদের বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্বখ্যাত রথ উৎসবের চূড়ান্ত শুভ ক্ষণটি সমাগত হয়, যা সমস্ত বিশ্ববাসীকে আনন্দিত করে।

এই বছর স্নানযাত্রার মহিমান্বিত পথ অনুসরণ করে আগামী ১৬ জুলাই তারিখে মহাপ্রভুর রথের রশিতে টান পড়তে চলেছে। ভক্ত ও ভগবানের মিলনভূমি ওড়িশার এই পবিত্র উৎসব কেবলই কোনো প্রথা বা লৌকিকতা নয়। বরং মানুষের সুখ-দুঃখের মতোই ঈশ্বরের জীবনকেও যে সমান নিয়মে চালিত করা যায়, জগন্নাথধামই পৃথিবীর বুকে তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে যুগ যুগ ধরে চলছে।

স্নানযাত্রা ও রথযাত্রার এই গভীর পারম্পর্য আমাদেরকে আসলে শেখায় কীভাবে অসুস্থতা, একাকীত্ব ও চিকিৎসার পর আবার নতুন করে জীবনের মূল স্রোতে ফিরে আসা যায়। স্নানবেদী থেকে রথের রশি ছুঁয়ে গুন্ডিচা মন্দির পর্যন্ত যাত্রার এই মহিমান্বিত সফর আসলে মানুষের অন্তরাত্মার মুক্তির প্রতীক। তাই প্রতি বছর স্নানযাত্রার এই পুণ্যতিথি বিশ্ব দরবারে ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির উদার রূপটিকেই তুলে ধরে।

Previous post

শুভেন্দু সরকারের বড় পদক্ষেপ! অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে আসছে ‘গুন্ডাদমন বিল ২০২৬’

Next post

টাকা ডবল করতে চান ? পোস্ট অফিসের এই ধামাকেদার স্কিমে ৫ লাখ টাকা রাখলে পেয়ে যাবেন ১০ লাখ টাকা !

Post Comment

You May Have Missed