বড়মা সবার না সেলেবদের? কেন এই বছর ভোগান্তি পুণ্যার্থীদের? খোঁজ নিল HT বাংলা

বড়মা সবার না সেলেবদের? কেন এই বছর ভোগান্তি পুণ্যার্থীদের? খোঁজ নিল HT বাংলা

বড়মার মন্দিরের উল্টোদিকের গলির কাছে হঠাৎ হইহই শব্দ। কী ব্যাপার? দেখা গেল, একজন বৃদ্ধা পড়ে গিয়েছেন রাস্তায়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আর পারেননি। ঘামছেন ভীষণ গরমে। নিজেই বললেন, ‘মাথা ঘুরে গিয়েছে।’ কয়েকজন চোখেমুখে জল দিয়ে স্বাভাবিক করলেন তাঁকে। তারপরেও বড়মার কাছে পৌঁছাতে অপেক্ষা করতে হল আরও বেশ কিছুটা সময়। আসলে বড়মার মন্দির চত্ত্বর তখন ব্যস্ত বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির হাই ভোল্টেজ তারকাকে নিয়ে। ফলে সাধারণ মানুষের লাইন সাপের মতো গলির ভিতর দিয়ে ঘুরেই চলেছে।

মন্দির কমিটি ও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ

বাংলার কালীপুজো মানেই অনেকের কাছে নৈহাটির বড়মা। বহু দূরদূরান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ এই সময় নৈহাটি আসেন শুধু বড়মাকে এক ঝলক দেখার জন্য। কিন্তু বড়মার কাছে এসে এই বছর দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা বেশ অন্যরকম। বহু মানুষ মন্দির কমিটি ও পুলিশের ব্যবস্থাপনায় রীতিমতো বিরক্ত। সোশ্যাল মিডিয়া ছয়লাপ তাদের নিয়ে করা পোস্টে। সমস্যা ঠিক কোথায়? বড়মার মন্দিরে গিয়ে সবটা সচক্ষে দেখে এল হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা।

গলি তস্য গলি দিয়ে ঘোরা

নৈহাটি স্টেশন থেকে নেমেই সোজা পথ ধরে চলে যাওয়া যায় বড়মার মন্দিরে। অন্যদিকে ঘাট পেরিয়ে ওই একই রাস্তা বিপরীত দিক থেকে ধরে এলে বড়মার দর্শন করা যায়। কিন্তু এই বছর রাস্তার সামনেই ব্যারিকেড আটকে পথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গলিপথে কিছুটা এগিয়ে আবার অন্য গলি দিয়ে যেতে হয়। ফলে মায়ের কাছে পৌঁছাতে কয়েক মিনিটের বদলে আধঘণ্টা সময় লাগছে। ভিড় বাড়লে ভোগান্তি বাড়ছে মানুষের।

সেলেবদের জন্য আলাদা নিয়ম..

কালীপুজোর সময় মূল মন্দিরের দরজা থাকে বন্ধ। তবে সেলেবদের জন্য আলাদা নিয়ম। কালীপুজো উপলক্ষে বড়মায়ের বেদির সামনে বসে পুজো দিতে দেখা যায় রাজ চক্রবর্তী ও শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়কে। পুজো দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়া, পুজো দিয়ে গিয়েছেন কাঞ্চন মল্লিক, শ্রীময়ী চট্টরাজও। তাঁদের ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে সেসব ভিডিয়োও।

‘আপনি কি চুরি, তোলাবাজি করেন?’

মন্দিরের পাশের ফুটপাথেই দীর্ঘদিন ধরে দোকান উজ্জ্বল বসুর (নাম পরিবর্তিত)। সেলেব প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি বললেন, ‘আপনি কি চুরি, তোলাবাজি, ধর্ষণ, খুন করেন?’ প্রশ্ন শুনে স্বাভাবিকভাবেই ভ্যাবাচ্যাকা খেতে হয়েছিল। সেই ঘোর কাটার আগেই তিনি বলে উঠলেন, ‘যদি না করে থাকেন, তাহলে মন্দিরে ঢোকার অনুমতি পাবেন না। বাইরে থেকে পুজো দিয়ে চলে যান।’

মাথায় হাত ব্যবসায়ীদের

অরবিন্দ রোডেই দশকর্মার দোকান চালান মানিক রায় (নাম পরিবর্তিত)। তাঁর অভিযোগ, ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেদিন এখানে এলেন, সেদিন মানুষকে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে।’ একই অভিযোগ শোনা গেল আরও অনেকের মুখেই। কারওর কারওর ব্যঙ্গোক্তি,‘বড়মা এখন বড়লোকের মা হয়ে গিয়েছেন’! অরবিন্দ রোডের আরেক ব্যবসায়ী মা কংকালী ফিশ সেন্টারের মালিক যেমন সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘বড়মার কারনে বিগত ৪ দিন ধরে আমাদের মাছের গাড়ি অরবিন্দ রোডে ঢুকতে পারছে না। যারা বলছে বড়মা আবেগ, ভালোবাসা, তাদের ইনকামের জায়গা ঠিক আছে বলে এইসব কথা বেরোচ্ছে।’

HT বাংলাকে যা বললেন নৈহাটির বিধায়ক

নৈহাটির বিধায়ক সনৎ দে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলাকে বললেন, ‘যাঁরা বলছেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আসার কারণে সাধারণ মানুষকে দুই-আড়াই ঘণ্টা দাঁড়াতে হয়েছে, তাঁরা মিথ্যাচার করছেন। তিনি যখন বড়মার দর্শন করেন, তখনও সাধারণ দর্শনার্থীদের দর্শন বন্ধ করা হয়নি।’ প্রমাণ হিসেবে তিনি ফেসবুকে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেছেন, সেখানে দেখা যাচ্ছে অভিষেক পুজো দিচ্ছেন। দর্শনার্থীরা মায়ের দর্শন করে বেরিয়ে যাচ্ছেন।

কেন ১০ মিনিটের রাস্তা ৩০ মিনিট লাগছে?

তবে গলির ভিতর এতটা ঘোরানোর কারণ কী, কেনই বা ১০ মিনিটের রাস্তা ৩০ মিনিট লাগছে? এই প্রসঙ্গে বিধায়কের বক্তব্য, ‘এই বছর ভিড় বেশি হতে পারে বলে আগে থেকেই অনুমান করেছিল পুলিশ। হয়েছেও তাই। সেই কারণেই গলির ভিতর দিয়ে ঘুরিয়ে ভিড় সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। বছরের অন্য সময় মায়ের কাছে পুজো দিতে গেলে অন্তত দু ঘণ্টা লাগে, সেখানে এখন আধঘণ্টা লাগছে।’ তবে এই সময়টা লাগছে শুধুমাত্র বড়মায়ের দর্শন পেতেই।

‘…কুৎসা রটাচ্ছেন’

অনেকের অভিযোগ, পুজোটা শাসক দলের কিছু নেতৃবর্গ নিজেদের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করছেন, যে কারণে সাধারণ মানুষের এত ভোগান্তি। অভিযোগ নস্যাৎ করে সনৎ দে জানালেন, ‘এই পুজোর সবকিছুর পরিচালনায় থাকে মন্দির কমিটি। মন্দির কমিটির প্রেসিডেন্ট এখানকার পুরসভার চেয়ারম্যান। মন্দির কমিটি বা ট্রাস্টি বোর্ড, কোনও কিছুতেই শাসকদলের কেউ মাথা গলান না। যাঁরা এসব বলছেন, তাঁরা কুৎসা রটাচ্ছেন। এখানে কোনও দলবাজি হয় না। তাছাড়া, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, অর্জুন সিংরা এসে নির্বিঘ্নে পুজো দিয়ে গিয়েছেন। বিজেপির অন্যান্য জেলা সভাপতিরাও আসছেন। দলবাজি হলে কি তাঁরা পুজো দিতে পারতেন?’

শাসকদলের স্থানীয় নেতার পরামর্শ…

বড়মায়ের পুজো এই বছর অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ঘিরে উত্তাল। স্থানীয় ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের অনেকেই পুজোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে শাসকদলের স্থানীয় এক নেতার পরামর্শ, ‘বড়মা সারা বছরই নৈহাটিতে থাকেন। এই চারদিন বাদ দিয়ে বছরের বাকি ৩৬১ দিন আসুন মায়ের দর্শনে। পুজো দিয়ে যান।’ কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন অনেকের, ‘২১ ফুটের দীর্ঘ কালীমূর্তির জন্যই বিখ্যাত হয়েছিল বড়মায়ের পুজো। মায়ের সেই সুবিশাল মনোহর মূর্তি কি বছরের বাকি দিনগুলোয় দেখা সম্ভব?’

Post Comment

You May Have Missed