ইউনূসকে চালাচ্ছে কে? আদিলুর রহমান! সংখ্যালঘু নিধন, হাসিনাকে তাড়ানো, সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ– সব চক্রান্তের আসল মাথাকে চিনুন…
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মহম্মদ ইউনূসের (Mohammed Yunus) উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। তাঁর বিতর্ক ও বর্ণাঢ্য জীবনের নেপথ্যে রয়েছে অনেক কিছু।
বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের (Bangladesh Interim Government) অন্যতম উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানকে (Adilur Rahman Khan) ঘিরে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা মহলে নানা আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে তিনি দীর্ঘদিনের লড়াকু মানবাধিকার কর্মী (Human Rights Activist) হিসেবে স্বীকৃত, অন্যদিকে তাঁর অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগও সামনে এসেছে। মানবাধিকার রক্ষা বনাম উগ্রপন্থা—এই দুই মেরুর সমীকরণে আদিলুর রহমান খানের ভূমিকা এখন জনমনে কৌতূহলের বিষয়।

এক নজরে আদিলুর রহমান খান:
জন্ম ও শিক্ষা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র।
প্রতিষ্ঠাতা: মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ (১৯৯৪)।
প্রাক্তন পদ : ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (২০০১-২০০৭)।
বর্তমান: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয় ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও রাজনৈতিক পটভূমি
আদিলুর রহমান খান মূলত একজন আইনজীবী এবং মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া আদিলুর নব্বইয়ের দশকে স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৪ সালে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে তিনি ‘অধিকার’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বাংলাদেশে গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল কাজ করে আসছে। তাঁর এই মানবাধিকারমূলক কাজের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর বেশ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: ২০১৩-র শাপলা চত্বর ও কারাবরণ
আদিলুর রহমান খানের জীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের পর। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে তাঁর সংস্থা ‘অধিকার’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে ৬১ জন নিহত হওয়ার দাবি করা হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই তথ্যকে ‘বিভ্রান্তিকর’ ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে অভিহিত করে। ফলস্বরূপ, ২০১৩ সালের আগস্টে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। যদিও আন্তর্জাতিক চাপ ও মানবাধিকার কর্মীদের দাবির মুখে তিনি জামিনে মুক্তি পান, তবে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় তাঁকে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে।
সাম্প্রতিক অভিযোগ ও গোয়েন্দা তৎপরতা
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আদিলুর রহমান খান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। তবে তাঁর নিয়োগের পর থেকেই নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে কিছু মহল দাবি করছে যে, বর্তমান বাংলাদেশে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থানের পেছনে আদিলুর রহমানের প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে। গত বছরে জুলাই আগস্ট এর শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাসে ডেরা বেঁধে দেশজুড়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর নির্দেশ দেন। তারই নির্দেশে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে ১৩ পুলিশ কর্মীকে পিটিয়ে মেরে লাশ গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। রাজনৈতিক পালাবদলের পরে উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করেন ইউনূস তাঁকে। ইসলামী জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ও তাদের কাছে অস্ত্র পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছেন
অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি তুরস্ক ও অন্যান্য মুসলিম দেশ থেকে আসা তহবিল ব্যবহার করে বিভিন্ন রক্ষণশীল গোষ্ঠীকে সংঘবদ্ধ করছেন। এমনকি পাকিস্তান ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশে আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরির অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে তোলা হচ্ছে। যদিও তাঁর সমর্থকরা এই অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
মালয়েশিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টতা
আদিলুর রহমানকে নিয়ে আরেকটি বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল ২০১৭ সালে। সে বছর জুলাই মাসে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে সেখানকার ইমিগ্রেশন দপ্তর তাঁকে আটক করে এবং পরদিন বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। সেই সময় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল যে, কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি বা আন্তর্জাতিক উগ্রপন্থার সাথে সম্পৃক্ততার সন্দেহে তাঁকে দেশটিতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি কি না। যদিও তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে তিনি বাধার সম্মুখীন হন।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও প্রশাসনিক অবস্থান
উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আদিলুর রহমান বর্তমানে শিল্প খাতের আমূল পরিবর্তনে মনোযোগ দিয়েছেন। বিশেষ করে বিসিক শিল্প নগরীতে গত সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় বরাদ্দ দেওয়া প্লটগুলো বাতিলের সাহসী ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তিনি চান প্রকৃত উদ্যোক্তারা যেন কাজের সুযোগ পান।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদিলুর রহমান খানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করা। একদিকে তাঁর মানবাধিকারের লড়াইয়ের ইতিহাস, অন্যদিকে উগ্রপন্থার পৃষ্ঠপোষকতার গুরুতর অভিযোগ—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা তাঁর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা।
নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা
আদিলুর রহমান খান তাঁর পুরো জীবনে যে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের জন্য লড়াই করেছেন, এখন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে সেই আদর্শকেই শিল্প ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চাইছেন। বরিশালের এই সফরের মাধ্যমে তিনি একটি স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন শিল্প কাঠামোর বার্তা দিয়েছেন।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলাই এখন তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রকৃত উদ্যোক্তারা মনে করছেন, আদিলুর রহমানের এই কঠোর অবস্থান দেশের শিল্প খাতে বিনিয়োগের নতুন পরিবেশ তৈরি করবে।
আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর আইনি জটিলতা এবং বর্তমান অবস্থা বেশ দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ। নিচে তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান মামলাগুলোর বিস্তারিত এবং বর্তমান আইনি প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হল:
১. শাপলা চত্বরের নিহতের সংখ্যা নিয়ে মামলা (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন)
এটিই আদিলুর রহমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত মামলা। ২০১৩ সালের মে মাসে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের পর ‘অধিকার’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, সরকারি অভিযানে ৬১ জন নিহত হয়েছে।
মামলার ভিত্তি: তৎকালীন সরকার এই প্রতিবেদনকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর দাবি করে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ (DB) আদিলুর রহমান ও সংস্থাটির পরিচালক এএসএম নাসিরুদ্দিন এলানের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনের ৫৪ ধারায় মামলা করে।
গ্রেফতার ও কারাবরণ: ২০১৩ সালের ১০ আগস্ট তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ৬২ দিন কারাবরণের পর হাইকোর্ট থেকে জামিন পান তিনি।
২০২৩ সালের রায়: দীর্ঘ ১০ বছর বিচার কাজ চলার পর ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদিলুর ও এলানকে ২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন। এই রায়টি দেশে ও বিদেশে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
২. বর্তমান অবস্থা: দণ্ড স্থগিত ও খালাস প্রক্রিয়া
৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে।
দণ্ড স্থগিত: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের আগে ও পরে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর এই সাজা স্থগিত করা হয়। বর্তমান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি জামিনে ছিলেন।
খালাস আবেদন: তাঁর আইনজীবী প্যানেল এই মামলাটিকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক’ হিসেবে চিহ্নিত করে এটি পুরোপুরি প্রত্যাহারের (Quashment) আবেদন প্রক্রিয়াধীন রেখেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান আইনি সংস্কারের অংশ হিসেবে তিনি এই মামলা থেকে পূর্ণ খালাস পাবেন।
৩. মালয়েশিয়ায় আটক ও আন্তর্জাতিক ডসিয়ার
২০১৭ সালে কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে তাঁকে আটকের পর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে একটি ‘আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ডসিয়ার’ বা গোয়েন্দা নথি তৈরি হওয়ার গুঞ্জন ওঠে।
আইনি চ্যালেঞ্জ: সে সময় মালয়েশিয়া সরকার সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধের চার্জশিট দেয়নি, বরং ‘ইমিগ্রেশন ব্ল্যাকলিস্ট’ দেখিয়ে তাঁকে ফেরত পাঠায়। বর্তমানে উপদেষ্টা পদে আসীন হওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই আন্তর্জাতিক ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ থেকে তাঁর নাম সরিয়ে ফেলার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
আদিলুর রহমান খানের আইনজীবীদের মতে, বিগত ১৫ বছরে তাঁর বিরুদ্ধে যতগুলো মামলা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তার প্রতিটিই ছিল তাঁর মানবাধিকারমূলক কাজকে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা। তবে সমালোচকদের দাবি, এই মামলাগুলোর নিরপেক্ষ পুনঃতদন্ত প্রয়োজন যাতে সত্য উদ্ঘাটিত হয়।
নতুন বাংলাদেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আদিলুর রহমান খানের নতুন পদক্ষেপগুলো দেশের স্থিতিশীলতা ও মানবাধিকার রক্ষায় কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)



Post Comment